ইকবাল মাহমুদ হাসান
প্রকাশ: ০২:১৭, ২৩ জুলাই ২০২৬
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিবৃষ্টির ঘটনা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকা এবং উজান থেকে নেমে আসা নদীগুলোর অববাহিকায় অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টির পর হঠাৎ করে পানির স্রোত বেড়ে যাওয়ায় হড়পা বানের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, কৃষিজমি এবং স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্প ধারণক্ষমতা বাড়ছে, যা কিছু অঞ্চলে আরও তীব্র বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিটি হড়পা বানের জন্য শুধু জলবায়ু পরিবর্তন দায়ী নয়; পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য এলাকা এবং সীমান্তবর্তী নদী অববাহিকাগুলো হড়পা বানের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। উজানে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসায় অনেক সময় স্থানীয় মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পান না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদী, ছড়া বা খালের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে বসতবাড়ি প্লাবিত হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং কৃষিজমিতে দাঁড়িয়ে থাকা ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ন ও ভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার এই ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। অনেক এলাকায় প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট, খাল দখল এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় অল্প সময়ের বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে বনভূমি কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি মাটিতে শোষিত হওয়ার পরিবর্তে দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে, ফলে হড়পা বানের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষক ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “স্বল্প সময়ের অতিবৃষ্টি এখন অনেক জায়গায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। আগাম পূর্বাভাস, স্থানীয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।”
পরিবেশ গবেষক ডক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ সংরক্ষণ এবং পাহাড় ও বন রক্ষা করা গেলে হড়পা বানের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। শুধু দুর্যোগের সময় ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”
সুনামগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলেন, “রাতে বৃষ্টি শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চারদিকে পানি চলে আসে। অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় না।” বান্দরবানের বাসিন্দা রওশন আরা বলেন, “পাহাড়ি ঢল নামলে ভয় কাজ করে। পরিবার নিয়ে দ্রুত নিরাপদ জায়গায় যেতে হয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হড়পা বানের ঝুঁকি কমাতে আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, নদীর পানি পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি, কমিউনিটিভিত্তিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি নদী, খাল ও জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, পাহাড় কাটা বন্ধ করা, বন সংরক্ষণ এবং টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি খাতেও অভিযোজনমূলক উদ্যোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বন্যা সহনশীল ফসলের জাত, উন্নত নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং কৃষকদের জন্য দ্রুত আবহাওয়া তথ্য পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দ্রুত পুনর্বাসন, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, আকস্মিক ভারী বৃষ্টি এবং হড়পা বান এখন শুধু মৌসুমি দুর্যোগের বিষয় নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে মানুষের জীবন, জীবিকা এবং অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।