৩ আশ্বিন ১৪৩৩ , সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

বাজেটে পরিবেশ কি পেল, কি পাওয়ার কথা 

সৈয়দ সাফিউল হাসান চিশতী

প্রকাশ: ১৬:৪৯, ২০ জুন ২০২৬

বাজেটে পরিবেশ কি পেল, কি পাওয়ার কথা 

ছবি: সংগৃহীত

২০২৬- ২৭ সালের অর্থবছরের  প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে পরিবেশ সংরক্ষণ জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিঘাত মোকাবেলা এবং একটি সবুজ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিকল্পনা এবং বরাদ্দ রাখা হয়েছে । 

পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য ২২৪০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা গত অর্থবছরে ছিল ২১৪৪ কোটি টাকা। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকারক প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য বরাবরের মতো একশত কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ৩৮৯৬ কোটি টাকা শুধু অভিযোজন, বন্যা ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় সুরক্ষার জন্য রাখা হয়েছে বলা হয়েছে। 

পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপন করা হবে পূর্বের নীতি অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে প্লাস্টিক বর্জ্য ৩০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বায়ু দূষণ রোধ করার ইলেকট্রিক্যাল ভেহিকেল এসব ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশ সংস্থা সমূহের মতে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য একটি আদর্শ বাজেট হওয়া উচিত মোট জিডিপির কমপক্ষে তিন ভাগ থেকে পাঁচ ভাগ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য তা অবশ্যই জরুরী ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ অনেক উন্নত অঞ্চলে জলবায়ু এবং পরিবেশ খাতে মোট বাজেটের ১০ ভাগ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত রাখা হয় । 

২০২৬ সালের অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেটে জলবায়ু , পরিবেশ সংশ্লিষ্ট ২৫টি মন্ত্রণালয় মিলে  দেয়া হয়েছে ৫১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা যা মোট জাতীয় বাজেটের ৫.৫ ভাগ । যদিও বিগত অর্থবছরগুলোতে বিশেষ করে ২০২৪-২৫ বা ২০২৫-২৬ এ তা ১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। সামগ্রিকভাবে বাজেট  বাড়লেও শতকরা হারে পরিবেশের জন্য তা অনেক কমেছে। বর্তমান পরিবেশ এবং জলবায়ুর খাতে বাংলাদেশের মোট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৭৬ ভাগ। বিশেষজ্ঞদের দাবি  এই বরাদ্দ জিডিপের অন্তত ৩.০ ভাগে উন্নতি উন্নীত করা প্রয়োজন।

আগের বছরগুলো থেকে দেখা গেছে বাংলাদেশ তার নিজস্ব সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে  আশানুরূপ অর্থ না পাওয়ায় একটি বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। সমন্বিত জলবায়ু বাজেটের সূচনা শুরু হয় ২০১৮ সাল থেকে। অর্থাৎ ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশের ২৫ টি মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক জলবায়ু বাজেট প্রদান শুরু হয়। তখন থেকে বরাদ্দ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ছিল ৪২,২০৬ কোটি টাকা যা বাজেটের ১০. ০৯ ভাগ, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ছিল ৪১,২০৮ কোটি টাকা যা মোট বাজেটের ১০.০৭ ভাগ।।

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ খাতের জন্য বেশ কিছু বড় উদ্যোগ ও বরাদ্দ বাড়ানো হলেও এবং বাজেটটিতে নীতিগত সদিচ্ছা ও বৃক্ষরোপণের মতো কিছু দৃশ্যমান লক্ষ্য থাকলেও, বাস্তবিক অর্থে বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকির বাস্তবতার তুলনায় অর্থায়ন ও কাঠামোগত বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।  জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। 

বাজেটে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।  গত কয়েক অর্থবছর ধরেই এই বরাদ্দের পরিমাণ একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এই বরাদ্দ একেবারেই অপর্যাপ্ত।

উপকূলীয় অঞ্চলের অভিযোজন ও সুপেয় পানির সংকট উপেক্ষা করা হয়েছে বাজেটে। এই বাজেট তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো জরুরি অভিযোজন প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে।   

উপকূলীয় অঞ্চলের পুরনো পোল্ডার সংস্কার, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এবং স্লুইস গেট ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত তহবিল নেই। 

দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তীব্র সুপেয় পানির সংকট দূর করতে রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং (বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ), পুকুরভিত্তিক ফিল্টার বা ছোট আকারের লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্টের জন্য বিশেষ কোনো বাজেট কাঠামো রাখা হয়নি।

বনায়ন কর্মসূচিতে "মান"-এর চেয়ে "সংখ্যা"-কে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে আগামী ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর (এবং এই অর্থবছরে ব্লক প্ল্যান্টেশনের আওতায় ৪.২৮ কোটির বেশি চারা রোপণের) ঘোষণা দিয়েছে।  

তবে চারার বেঁচে থাকার হার নিয়ে আমাদের পূর্বের ধারণা সুখকর নয় অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের প্রকল্পে কতটি গাছ লাগানো হলো সেই সংখ্যাকেই বড় করে দেখা হয়, কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশিরভাগ চারাই মারা যায়।

নতুন চারা রোপণের বাজেট থাকলেও, দেশের বিদ্যমান প্রাকৃতিক বন, পাহাড় এবং জলাশয়গুলোকে দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক কোনো দিকনির্দেশনা বা বিশেষ বরাদ্দ বাজেটে দেখা যায়নি।নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বৈষম্য ও সীমিত পরিধিইলেকট্রিক ভেহিকেল এবং সোলার প্যানেলের ওপর শুল্ক ছাড় দেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবসায়ীরা সমালোচনা করে বলেছেন—এই সুবিধাগুলো মূলত বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা মাথায় রেখে সাজানো হয়েছে।

ছাদ সৌর বিদ্যুৎ ছোট-মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য মাঠপর্যায়ে কোনো বড় প্রণোদনা দেওয়া হয়নি, যা তৃণমূল পর্যায়ে সবুজ জ্বালানির রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করবে।

বায়ু দূষণ রোধে নতুন মনিটরিং স্টেশন স্থাপন বা ই-বর্জ্য নির্দেশিকার কথা বলা হলেও, অবৈধ ইটভাটা বা কলকারখানার বর্জ্য নিঃসরণ বন্ধে জরিমানা ও আইন প্রয়োগের বাস্তব কোনো রূপরেখা বাজেটে অনুপস্থিত।

তাছাড়া পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে যুক্ত করা উচিত ছিল । যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌর বিদ্যুৎ ,বায়ো বিদ্যুৎ এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আলাদা তহবিল রাখার দরকার ছিল। ঢাকার  চারপাশে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা সহ দেশের প্রধান নদীগুলোর বর্জ্য পরিষ্কার এবং রাসায়নিক দূষণ বন্ধে বিশেষ ওয়াশ ফান্ড থাকার দরকার ছিল।

শীতকালে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশে পরিণত হয়। ইটভাটার আধুনিকীকরণ, কারখানা ধোয়া নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠায় খুব দ্রুত উদ্যেক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার দরকার ছিল । উপকূলের মানুষগুলোর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ,সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানোর দরকার ছিল।

স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার আশঙ্কা জনক হারে বেড়েছে । এ পণ্যগুলোর নিরাপদ ধ্বংস , রিসাইকেল করার জন্য সরকারি পর্যায়ে আধুনিক প্লান্ট স্থাপন করা দরকার।

পরিবেশবাদীদের মতে, এক মন্ত্রণালয় যখন নদী বা খাল খনন করছে, অন্য মন্ত্রণালয় তখন বড় পরিকাঠামো প্রকল্পের নামে জলাশয় ভরাট বা পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EIA) ছাড়াই প্রকল্প অনুমোদন করছে। এই সামষ্টিক সমন্বয়হীনতা বাজেটটিকে পুরোপুরি "সবুজ" হতে দেয়নি।

লেখক , আহবায়ক, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ 
ইমেইল:[email protected]

আরও পড়ুন