প্রকাশ: ২২:৪৪, ১৬ মে ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ফারাক্কা বাঁধ ইস্যুটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি সংবেদনশীল এবং ভূ-রাজনৈতিক বিষয়। গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উভয় দেশেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তি রয়েছে।ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গা নদীর উপর ফারাক্কা বাঁধ অবস্থিত । এটি গঙ্গার উপর নির্মিত একটি বিশাল স্থাপনা যা হুগলি নদীতে জলপ্রবাহ করতে এবং জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যবহৃত হয়। ১৯৬১ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৭৪ সালের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এ বাধটি সড়ক ও রেলপথ সেতু হিসেবে ব্যবহৃত হয়।।
গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে ১৯৫২ সাল থেকে আলাপ আলোচনা শুরু হলেও পাকিস্তান সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নেয়নি । ফলে ভারত তা ভারতের মতো করে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছে। ১৯৭৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ভারত তিস্তা ব্যারেজ দিয়ে পানি প্রত্যাহার শুরু করে।
১৯৭৬ সালে মাওলানা ভাসানী বিষয়টি তাৎপর্য সহকারে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ মহাসচিব কে অবহিত করেন। তিনি ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি লংমার্চ করেন। লাখো মানুষের এই লং মার্চটি বিশ্বব্যাপী সাড়া ফেলেছিল। ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে রোববার এই লংমার্চে অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহীতে শুরু হয় লংমার্চ টি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গিয়ে শেষ হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার উজানে ফারাক্কা বাঁধ অবস্থিত।
বিরূপ প্রভাবের কথা আগে বলেনেই। ফারাক্কা বাঁধে দীর্ঘমেয়াদী কুপ্রভাবের কারণে পদ্মা সহ অন্য তিন নদী মহানন্দা , পাগলা ও পুনর্ভবা শুকিয়ে যাচ্ছে।নদীতে নাব্যতার সংকট দেখা দিয়েছে। আবার বর্ষার সময়ে ব্যারেজের দরজা খুলে দেয়ার কারণে বন্যা ও নদী ভাঙ্গনের প্রবণতা বেড়েছে।
১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রথম ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ।এই চুক্তিতে শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি সরবরাহের কথা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি।
১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ৩০ বছর মেয়াদে গঙ্গা পানি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর এক জানুয়ারি থেকে ৩১শে মে পর্যন্ত বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাত্র তিন বার ভারতের চুক্তি অনুযায়ী পানি পাওয়া গেছে।
কয়েকদিন আগে একটি জাতীয় দৈনিকে এ বিষয়ে একজনের লেখা পড়লাম।তিনি লিখেছেন ভারত বাংলাদেশের স্বার্থেই ফারাক্কা বাধ ভেঙে দেয়া প্রয়োজন।। বিশ্লেষনে এই দাবির পক্ষের মূল যুক্তিগুলো হচ্ছে বাঁধের কারণে গঙ্গার উজানে (ভারতে) এবং ভাটিতে (বাংলাদেশে) প্রচুর পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে নদীর ধারণক্ষমতা কমে বর্ষাকালে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।
গঙ্গার পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লোনা পানির অনুপ্রবেশ বাড়ছে। এর ফলে সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে এবং কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে।বাঁধের কারণে পানির স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙন প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাঁধ সরিয়ে নিলে নদী তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। বাঁধ মাছের (বিশেষ করে ইলিশ) প্রজনন ও চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, যা সামগ্রিক মৎস্য শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
কিন্তু ভারত মূলত কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা এবং সেচ কাজের প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্র করে এই বাঁধের গুরুত্ব তুলে ধরে।ফারাক্কা বাঁধের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিডার ক্যানালের মাধ্যমে ভাগীরথী হুগলি নদীতে প্রবাহিত করা, যাতে কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বজায় থাকে। বাঁধ সরিয়ে দিলে পলি জমে বন্দরটি অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিশাল এলাকার কৃষি জমি এই বাঁধের ওপর নির্ভরশীল। বাঁধটি না থাকলে শুষ্ক মৌসুমে এই অঞ্চলে সেচ সংকট দেখা দেবে।বাঁধটি বর্তমানে পানি নিয়ন্ত্রণের একটি মেকানিজম হিসেবে কাজ করে। হুট করে এটি ভেঙে ফেললে ভাটি অঞ্চলে (বিশেষ করে বাংলাদেশে) তাৎক্ষণিক ও ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।এই বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং শিল্পকারখানাগুলো পানির জন্য বাঁধের ওপর নির্ভরশীল।বর্তমানে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বাঁধটি "ভেঙে ফেলা" বা "রেখে দেওয়া"—এই শক্ত অবস্থানের চেয়ে যৌক্তিক পানি ব্যবস্থাপনা বেশি জরুরি।।
২০২৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নদীটির পানিবণ্টন নবায়ন বা একটি নতুন রূপরেখা প্রণয়ন উভয় দেশের জন্যই ভূ-রাজনীতি, পরিবেশ এবং অর্থনীতির দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের চুক্তি নবায়নের সময় ১৯৯৬ সালের চুক্তির মূল কাঠামো এবং এর সীমাবদ্ধতাগুলো জানা জরুরি।
ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রাপ্যতাকে ভিত্তি করে তিন দশকে পানি বণ্টনের একটি নির্দিষ্ট সূত্র নির্ধারণ করা হয়েছিল । যদি ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রাপ্যতা ৭০,০০০ কিউসেক বা তার কম হয় তবে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই ৫০% করে পানি পাবে।যদি প্রাপ্যতা ৭০,০০০ থেকে ৭৫,০০০ কিউসেক হয় তবে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবে ৩৫,০০০ কিউসেক পানি পাবে এবং বাকি পানি ভারত পাবে।যদি প্রাপ্যতা ৭৫,০০০ কিউসেকের বেশি হয় তবে ভারত পাবে ৪০,০০০ কিউসেক এবং বাকি পানি পাবে বাংলাদেশ।
বর্ষাকালে নেপালে প্রচুর পানি থাকে। নেপালে জলাধার (Reservoir) নির্মাণ করে বর্ষার পানি ধরে রাখা এবং শুষ্ক মৌসুমে তা গঙ্গায় ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে পানির প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব। ২০২৬ সালের চুক্তিতে নেপালকে পর্যবেক্ষক বা সহযোগী পক্ষ হিসেবে যুক্ত করার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী, পানি হলো রাজ্যতালিকাভুক্ত বিষয়। ১৯৯৬ সালের চুক্তির সময় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০২৬ সালেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী এবং বিহার সরকারের স্বার্থ ও আপত্তির বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতকে এমন একটি সমীকরণে পৌঁছাতে হবে যাতে কলকাতা বন্দরও সচল থাকে এবং বাংলাদেশের পদ্মা ও গড়াই নদীও শুকিয়ে না যায়। বিহার রাজ্য প্রায়ই ফারাক্কা ব্যারেজের কারণে সৃষ্ট ব্যাকওয়াটার বন্যা এবং পলি জমার অভিযোগ তোলে। নতুন চুক্তিতে ফারাক্কা ব্যারেজের আধুনিকীকরণ ও পলি অপসারণের যৌথ উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত করলে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সমর্থন পাওয়া সহজ হবে।
২০২৬ সালের চুক্তিটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের সাথে জড়িত। বাংলাদেশকে অত্যন্ত সুকৌশলী ও জোরালো কূটনীতি প্রদর্শন করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরের বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিসমুহ,ভারত যেসব দলসমুহ বা ব্যাক্তিবর্গের সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে, সরকারের উচিত হবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এদের সবাইকে নিয়ে একসাথে কাজ করা।
গঙ্গার পানি না পাওয়ার কারণে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য চাষ, সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ ধ্বংস হওয়া এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান ভারতের কাছে টেবিল টপ বৈঠকে উপস্থাপন করতে হবে।
জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক নদী ব্যবহার কনভেনশন ১৯৯৭ এর নীতিগুলো, যেমন—'ন্যায্য ও যৌক্তিক ব্যবহার' এবং 'গুরুতর ক্ষতি না করার বাধ্যবাধকতা নতুন চুক্তির খসড়ায় যুক্ত করার দাবি জানাতে হবে। ভারতের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে বাংলাদেশের ভেতরেই গঙ্গা বা পদ্মা নদীর ওপর একটি মাল্টিপারপাস ব্যারেজ নির্মাণের বিষয়টি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বর্ষাকালের উদ্বৃত্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের এই সক্ষমতা থাকলে ভারতের সাথে দরকষাকষিতে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
-সৈয়দ সাফিউল হাসান চিশতী
আহ্বায়ক, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ