সৈয়দ সাফিউল হোসেন চিশতী
প্রকাশ: ১৯:৫৯, ৬ জুন ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
৫ই জন বিশ্বব্যাপী বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হলো। নিয়মমাফিক তা পালিত হয়ে থাকে প্রতিবছরই। বাংলাদেশ ও এর ব্যতিক্রম নয়। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিপরীতে জলবায় নিরাপত্তা কি সঠিক পথে আছে, এ নিয়েই আজকের আলোচনা।।
রাজধানীর ইব্রাহিমপুরের গৃহিণী সৈয়দা মারুফা নুসরাত। তিনি গত কয়েকদিন ধরে রাতে ঘুমোতে পারছেন না। ভোর হওয়ার পর তার ঘুমাতে হচ্ছে। একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী মুশফিকা। তারও ঘুমাতে হচ্ছে সকালে। এতে করে তাদের স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় ঘটছে এবং দৈনন্দিন অন্যান্য কাজে ব্যাঘাত ঘটছে ।আর এর কারণ গত কয়েকদিন ধরে চলা এই তাপপ্রবাহ। দেশের ৪৯ জেলায় চলছে এই তাপ প্রবাহ।
গত কয়েকদিনের পত্রিকার খবর দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর গড়ে এক দশমিক ৬৬ মিলিমিটার করে নিচে নামছে বরিশাল নগরীর মাটির স্তর। এই নীরব ধ্বস যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের সমান হয়ে যাবে বরিশাল। তখন সামান্য জোয়ারেও তলিয়ে যেতে পারে এই নগরী।
জার্মানির সহায়তায় বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ও ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসাইন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেসের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য। স্যাটেলাইট ইমেজেও মাটির স্তর নেমে যাওয়ায় ভবন হেলে পড়ার প্রমাণ মেলে।
প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে তৈরি হওয়া উষ্ণ পানির বিশাল প্রবাহ চলতি বছরে শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর প্রভাবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খরা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। কারন ঋতু চক্র ক্রমশ ভেঙ্গে পড়ছে।
এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশের উপর পড়বে। ইতিমধ্যে তাপ প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে । মূলত পরিবেশ দূষণ হলো "কারণ" এবং জলবায়ু পরিবর্তন হলো তার "ভয়াবহ ফলাফল"।
এসবের কারণ প্রতিকার নিয়ে পূর্ব অনেক আলোচনা হয়েছে, লিখেছিও, হয়তো ভবিষ্যতেও লেখব। কিন্তু বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ গুলো আন্তর্জাতিক মহলে সঠিকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে কিনা, কিংবা সেগুলোর কার্যত ফলাফল কি এ বিষয়গুলোও প্রাসঙ্গিক।
পরিবেশ কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ফোরাম। বাংলাদেশ এই ফোরামে নেতৃত্ব দিয়ে জলবায়ু কূটনীতিতে কেবল 'ক্ষতিগ্রস্ত দেশের' কান্নাকাটি না করে, বরং 'জলবায়ু সমৃদ্ধি' বা রেজিলিয়েন্সের নতুন ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছে। এর অংশ হিসেবে এমসিপিপি বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখছে।
নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তীব্র সাইক্লোনের শিকার বাংলাদেশ জাতিসংঘে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির জন্য 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ' তহবিল কার্যকর এবং সরাসরি ছাড় করার জন্য জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোটের সাথে মিলে বাংলাদেশ দূষণকারী উন্নত দেশগুলোর ওপর জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। স্থানীয়ভাবে পরিচালিত অভিযোজন কৌশলে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল।
গত কয়েকটি জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন গুলোতে বাংলাদেশের কূটনীতি মূলত অর্থায়ন এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার আদায়ের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল।
আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত কপ ২৯ সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বার্ষিক ১.৩ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৩০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের একটি লক্ষ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এই বিশাল তহবিলের একটি বড় অংশই অনুদানের পরিবর্তে সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এর তীব্র বিরোধিতা করেছে, কারণ ঋণ গ্রহণ করলে দেশের ওপর ঋণের বোঝা বাড়বে। বাংলাদেশ সবসময় অনুদানের ওপর ভিত্তি করে অর্থায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অনিবার্য ক্ষয়ক্ষতি যেমন: উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, নদীভাঙন মোকাবিলায় লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল গঠনের পর তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত কপ ৩০ সম্মেলনে বাংলাদেশ অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি তুলেছে যে, এই তহবিলের অর্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী বা জটিল প্রকল্প প্রক্রিয়ার কারণে তহবিল যেন মাঝপথে আটকে না থাকে, বাংলাদেশ সেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতার পক্ষে জোরালো কূটনীতি চালাচ্ছে।
কপ ৩০ সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অভিযোজন তহবিল তিনগুণ করার বিষয়ে দেশগুলো একমত হয়েছে।বাংলাদেশের জন্য বাংলাদেশ এবং অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এই তহবিল ২০৩০ সালের মধ্যেই নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর জিডিপির প্রায় ৬.৭% ক্ষতি হচ্ছে, যার জন্য বিপুল পরিমাণ তাৎক্ষণিক অভিযোজন তহবিল প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় পর্যাপ্ত নয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি বৈশ্বিক মঞ্চে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ জলবায়ু সম্মেলনে তা এনডিসি ৩.০ করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে নিজস্ব কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়েছে, যা আন্তর্জাতিক তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নৈতিক অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে বিশ্বমঞ্চে বছরের পর বছর ধরে এত ভাষণ, চুক্তি আর কূটনীতির পরেও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এখনো নোনা পানির সংকটে ভুগছে, নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারাচ্ছে। কাগজে-কলমে অনেক বড় বড় ফান্ড বা তহবিলের ঘোষণা এলেও, বাস্তবে সাধারণ মানুষের কাছে সেই অর্থ পৌঁছানোর গতি খুবই ধীর।তবে এই স্থবিরতার মধ্যেও কূটনীতিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই, বরং এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পরিবেশ কূটনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
এখন আর নতুন কোনো চুক্তি বা নীতিমালার দরকার নেই। বাংলাদেশের কূটনীতিকে এখন এককভাবে জোর দিতে হবে যেন লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং অভিযোজন তহবিলের টাকা কোনো শর্ত ছাড়া সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়।
বৈশ্বিক কূটনীতির চেয়েও বাংলাদেশের জন্য এখন বেশি জরুরি ভারতের সাথে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি কার্যকর করা। শুষ্ক মৌসুমে পানি না পাওয়া এবং বর্ষায় বন্যা মোকাবিলায় দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে কঠোর অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ফান্ডের আশায় বসে না থেকে বাংলাদেশের নিজস্ব জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও অপচয় বন্ধ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাছাড়া শুধু অনুদানের অনুরোধ না করে বাংলাদেশকে এখন আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার দিকে হাঁটতে হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পথটি এখন বাংলাদেশের। এই বেনিফিটটি বাংলাদেশকে নিতে হবে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জলবায়ু বাধ্যবাধকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একটি মতামত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
বাংলাদেশ এই রায়কে হাতিয়ার করে ঐতিহাসিক দূষণকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি চাপ করতে পারে। এক্ষেত্রে ভানুয়াতুর সাথে কোস্পন্সর হতে পারে বাংলাদেশ।
পরিবেশ ধ্বংস বা জলবায়ু অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ইকোসাইড বা পরিবেশগত গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বৈশ্বিক আন্দোলনে বাংলাদেশেকে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সাহায্য বা অনুদান-নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি কূটনীতিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর কার্বন ট্যাক্স বসাচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য ইইউ-র সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করে গ্রীন সার্টিফিকেশন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য বিশেষ সুবিধা আদায় করতে হবে।
যেভাবে কোভিডের সময় টিকার আইপি ছাড়ের দাবি উঠেছিল, তেমনি জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির পেটেন্ট যেন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা হয়, তার জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় জোরালো লবিং করতে হবে।আঞ্চলিক নদী কূটনীতিতে বহুপাক্ষিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে। নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশগুলোকে একত্রিত করে একটি 'হিমালয়ান রিভার বেসিন কোয়ালিশন' গঠন করা উচিত। এর মাধ্যমে উজানের দেশ (ভারত ও চীন) থেকে পানির ন্যায্য অধিকার এবং রিয়েল-টাইম ডাটা পাওয়ার যৌথ কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা সম্ভব।
আঞ্চলিক পরিবেশগত দুর্যোগ মোকাবিলায় জলবায়ু নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করা। গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্ব ও নলেজ ডিপ্লোমেসি বাংলাদেশ 'লোকালি লেড অ্যাডাপ্টেশন' বা স্থানীয় অভিযোজনে বিশ্বের রোল মডেল। এই দক্ষতাকে কূটনীতিতে রূপান্তর করা দরকার।
বাংলাদেশে একটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অভিযোজন ইনস্টিটিউট বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বিশ্বের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশের বিশেষজ্ঞরা এসে প্রশিক্ষণ নেবেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
আফ্রিকান এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সাথে জোট বেঁধে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থায়নের শর্তগুলো শিথিল করার অভিন্ন দাবি তুলতে পারে।
সৈয়দ সাফিউল হোসেন চিশতী
আহবায়ক, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ
ইমেইল:[email protected]