২১ আশ্বিন ১৪৩৩ , অক্টোবর ৭, ২০২৬

আওয়ামী লীগ কি ফিরবে : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কি বলে

সৈয়দ সাফিউল হাসান চিশতী

প্রকাশ: ১৯:০২, ২৩ মে ২০২৬

আওয়ামী লীগ কি ফিরবে : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কি বলে

ছবি: সংগৃহীত

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০২২ সালে একটি গণঅভ্যুত্থানে শ্রীলংকার রাজাপাকশে পরিবার এবং তাদের দল এসএলপিপি এর পতন হয়। 

দলটি চরম বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ নীতি পরিচালনা করে শ্রীলংকার রাজনীতিতে সীমিত পরিসরে হলেও ফিরে এসেছে। এমনকি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। 

কিন্তু শুরুতে কেউ তা ভাবতেও পারেনি। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ,খাদ্য ,জ্বালানি বৈদেশিক মুদ্রার অভাব এসব কারণে অভ্যুত্থানের মুখে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়ে  রাজাপাকশে পালিয়ে যান।

শেখ হাসিনার মতোই গোটাবায়ে প্রথমে মালদ্বীপ পরে সিঙ্গাপুরে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। তার ভাই এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র রাজাপাকশেসহ পুরো পরিবারকে তীব্র গণরোষের মুখে পড়তে হয়। তাদের উপর চরম দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। দেশ ছাড়ার পর রাজাপাকশের পরিবার এবং তাদের দল টিকে থাকার কূটনীতি শুরু করে যা বর্তমানে আওয়ামী লীগের কৌশলের সাথে মিলে যায়। রাজাপাকশের পরিবার প্রথমে চীনের খুব ঘনিষ্ঠ থাকলেও অভ্যুত্থানের পরে ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া শুরু করে। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে শ্রীলংকার যে যুদ্ধাপরাধ তদন্ত চলছিল তা থামাতে আন্তর্জাতিক লবিঙ শুরু করে শুরু করে। পরবর্তীতে নির্বাচনে তারা ৩ শতাংশ ভোট পেলেও রাজনৈতিকভাবে ভালোভাবে ফিরে এসেছে।উদাহরণ আরো আছে।আর্জেন্টিনার হুয়ান পেরন এবং পেরোনিস্ট মুভমেন্ট। দীর্ঘ ১৮ বছর মাদ্রিদে নির্বাসনে থেকে ফিরে এসে আবার বিপুল ভোটে জিতে দেশের প্রেসিডেন্ট হন। তাইওয়ানে কুওমিনটাঙ দল আট বছরের ব্যবধানে আবার বিপুল ব্যবধানে ক্ষমতায় ফিরে আসে। বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী এবং তার দল কংগ্রেস তিন বছরের ব্যবধানে ফিরে এসেছিল।

বাংলাদেশের বর্তমান ভূ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতি প্রকৃতি শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়টি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমীকরণ এবং কূটনীতির উপর সম্ভাব্যতা দিয়েছে। কূটনীতি এখানে সরাসরি আসবে না আসবে শেডো কূটনীতি।একদিকে ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক শেখ হাসিনাকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। 

তবে গণবিক্ষোভের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দেশ ত্যগে বাধ্য হওয়া, দলীয় নেতা কর্মীদের উপর যে ধরনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল সে জায়গা থেকে বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণ লক্ষণীয়। বিশ্লেষকরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতা দেখছেন, পরিচ্ছন্ন নেতৃত্বের তাগিদ করছেন। তবে সবাই একটি বিষয় মত দিচ্ছেন যে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের মতো একটু বড় ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিকীকরনের উপর তাদের প্রত্যাবর্তন নির্ভর করছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার সামনে এখন শ্যাডো ডিপ্লোমেসি বা নেপথ্য কূটনীতি ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে টিকে থাকা  কঠিন হয়ে দাঁড়াবে ।ঠিক এই পথেই দলটি হাঁটছে।

রিয়েলিজমের প্রবক্তা মর্গান্থ এবং জন মিয়ারশাইমার তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নৈতিকতা দিয়ে চলে না, চলে ক্ষমতা এবং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার সমীকরণ দিয়ে। 

এ অনুযায়ী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ খুব ভালো করেই জানে যে আন্তর্জাতিক মহলে কোন স্থায়ী বন্ধু নেই ।তাই তারা নীতিগত আদর্শের চেয়ে নিজেদের কৌশলগত উপযোগিতা ভারতের কাছে উপস্থাপনার চেষ্টা করছে। প্রত্যেকটি রাষ্ট্রই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে।  আওয়ামী লীগ ভারতের নিরাপত্তা ভিত্তিকে কাজে লাগাবে এটাই স্বাভাবিক । তারা ভারতকে বুঝাচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদ বাড়বে।

আবার উদারতাবাদের প্রধান চিন্তাবিদ কোহেনে এবং জোসেফ নাই তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ, আইসিসি আন্তর্জাতিক আইন এবং বহুপাক্ষিক লবিঙকে গুরুত্ব দেন। পশ্চিমা বিশ্ব মানবাধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতি যেহেতু সংবেদনশীল তাই আন্তর্জাতিক পিয়ার ফার্ম এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামের বিষয়গুলো সামনে আনার চেষ্টা করছে। 

জোসেফ নাই যেমন বলেছেন জোড় খাটানো ছাড়াও কেবল নেরেটিভ তৈরি করে নিজের লক্ষ্য অর্জন করা যায়। আওয়ামী লীগ পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ত্রুটিগুলো তুলে ধরে বিশ্ব মঞ্চের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করবে আর এটাকে বলা হয় ক্লেনজিঙ দা নেরেটিভ। 

এসব বিষয়ে কথা বলেছি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের সাথে। তার মতে, জনগণের উপর নির্ভর করছে ফেরার বিষয়টি। জনগণ চাইলে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা ফিরবে। বাইরের বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিবে। 

এক্ষেত্রে তিনি আরো বললেন, আওয়ামী লীগ এর আগেও নিষিদ্ধ ছিল, ফিরে এসেছে। দশ বছর আগেও কেউ ভাবতো না বিএনপি ক্ষমতায় আসবে এবং তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলী আকবরের মতে জনগণ চাইলে আবারও আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরবে। আবেগ এবং মোহাবিষ্ট হওয়া বাঙালির জাতীয় চরিত্রের একটি। এক বছর আগে যে অবস্থা ছিল তা থেকে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। 

আবার দেখুন আইডেন্টিটি পলিটিক্স কি বলে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কেবল সামরিক বা অর্থনীতি ক্ষমতা দিয়ে চলে না বরং ইতিহাস, আদর্শ, পরিচয় এবং সামাজিক ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক পরিচয়  মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক এবং বাহক সংগঠন এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক শক্তি। অবশ্যই আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এ ধরনের বাইনারি ধারণা তৈরি করবে যে আওয়ামী লীগ মানে হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং প্রগতির রাজনৈতিক শক্তি এবং তার বাইরে যারা আছে তারা হয় ডানপন্থী না হয়ে মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তি। আওয়ামীলীগ ছাড়া বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা টেকানো সম্ভব নয়। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক রনি বসাকের মতে, দেশের এত বড় আদর্শিক জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকারের বাইরে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

মাইকেল কুগলম্যান কয়েকদিন আগে লিখেছেন শেখ হাসিনার বর্তমান কূটনীতি মূলত একটি অপেক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ কৌশল । তিনি ভারতের মাটিতে থেকে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের ছোটখাটো ভুল বা অর্থনৈতিক ব্যর্থতা গুলো  দেখানোর চেষ্টা করছেন। 

নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা আইনি চাপ কমানোর এবং নতুন সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশল নিয়ে দলটি এগুচছে।  আমরা মিডিয়া মারফত দেখেছি শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং দলের আন্তর্জাতিক উইঙ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে Stryk Global Diplomacy এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডনে প্যালেটাইন মিডিয়া বা প্যালেটাইন কমিউনিকেশন এর মত বড় বড় লবিং ফার্ম গুলোর সাথে কাজ শুরু করেছেন।

২০২৪ এর অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রিস্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হওয়া  হামলাগুলোকে ইতিমধ্যে পশ্চিমা বিশ্বে এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বড় করে প্রচার করা হয়েছে। আইসিটির রায়কে রাজনৈতিক প্রতিশোধ মূলক রায় হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে। বৈশ্বিক আইনী ফোরামে লবিঙ শুরু হয়েছে। তারা Doughty street chambers এর মতো শীর্ষ আন্তর্জাতিক আইনি ফার্ম এর মাধ্যমে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আবেদন করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝানোর চেষ্টা করছেন যে বিচারপতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত হয়ে এই রায় দিয়েছেন এবং এতে আন্তর্জাতিক মানদন্ড বজায় রাখা হয়নি। 

ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতারা ক্রমাগত এই বার্তা দিচ্ছেন যে বাংলাদেশে বর্তমান সরকার এবং অন্যান্য যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে তাদের কারণে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে । অতীতে বিএনপি আমলে যেভাবে উলফা বা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আশ্রয় পেয়েছিল সেই ইতিহাস মনে করে দেয়া হচ্ছে । তাছাড়া গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি ,পদ্মা ব্যারেজ , পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায় আসা এ বিষয়গুলো প্রভাব বিস্তার করবে ।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছে আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৫ বছরের বছরের উন্নয়ন, অর্থনৈতিকভাবে কতটা স্থিতিশীল এবং সফল ছিল, মেগা প্রজেক্ট, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এগুলো তুলে ধরা হচ্ছে । অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত  মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা , হত্যা, খুন, ধর্ষণ , সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরা হচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সূত্র বা সমীকরণ দিয়ে মিলানো হোক বা না হোক, দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাবে না, এটা স্বতঃস্ফূর্ত বলা যায়।

লেখক, আহ্বায়ক, চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ

আরও পড়ুন