বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০:৫০, ২২ মে ২০২৬
বেশ কিছুদিন ধরেই সরকারি কর্মকর্তাদের নামে নারী সম্পর্কিত কেলেঙ্কারি বিভিন্ন গণপমাধ্যমের সংবাদে উঠেছে এসেছে। কিন্তু কোনো সরকারি কর্মকর্তার নামে নারী ব্যবহার করে হানি ট্র্যাপে ফেলে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করার মতো নিকৃষ্ট কাজ করার অভিযোগ সচরাচর হয়নি। আর এমনই কাজ করার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে। তিনি হানি ট্র্যাপ ও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগে জানা যায়। এমনকি প্রধান প্রকৌশলীর পদে মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরী বসানোর জন্যও বদরুল হানি ট্র্যাপের ব্যবহার করেছেন বলে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করছেন৷
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্টুডেন্ট ভিসায় অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি নারী গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল ইসলাম খানের হানি ট্র্যাপের অংশ ছিলেন বলে দাবি করে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন বদরুল আলম খান মিডিয়া কর্মী ও হাই সোসাইটি কল গার্লদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদবীর বানিজ্যের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। এই সুন্দরী মিডিয়া কর্মীদের ব্যবহার করে তিনি অতি ক্ষমতাধর আমলা, রাজনীতিবীদদের হাত করে তার অগনিত সহকর্মীদের ব্ল্যাক মেইল আর তদবীর বানিজ্য করে শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। সেই টাকা আবার বান্ধবীদের দিয়ে বিদেশ পাচারও করেছেন। এদের কাউকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মতো মেলা মেশাও করেছেন বলে জানিয়েছেন ভূক্তভোগী এই নারী। এই নারী আগে দেশের প্রভাবশালী এক ইংরেজী দৈনিক পত্রিকার মালিকানায় অংশীদার ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে আগে থেকে বিবাহিত বদরুল ও দুই কন্যা সন্তানের জনক। ঢাকার খিলগাঁও এ ২২ নম্বর সড়কে প্লট নম্বর-ত/৫ এ যে বাড়িতে থাকেন সেটি তার শ্বশুরের। গতবছর এই নারী বদরুলের পাচার করা টাকাসহ অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান। প্রবাসে বসেও তাদের পরকিয়া সম্পর্ক চালু ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বদরুল এটিএন নিউজের এক সংবাদ পাঠিকাকে বিয়ে করলে, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ওই নারী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।
এই নারী আরো জানান, আওয়ামীলীগ সরকারের পুরোটা সময় বদরুল তাকে দিয়ে উচ্চ মহলে তদবীর করিয়েছেন। মহিলার ভাষ্য মতে তিনি নিজেকে সবচেয়ে প্রভাবশালী ইংরেজী দৈনিকের সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দিতেন। এই নারী দিয়ে বদরুল ধানমন্ডির শংকরে অবস্থিত নন্দিণী সোসাইটি তথা নন্দিণী হোটেলে প্রভাবশালী আমলাদের নিয়ে যেতেন। ফলে ওই আমলারা বদরুলের আবদার ফেলতে পারতেন না। এতে পূর্ত মন্ত্রনালয়ে বদরুল অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেন।
বদরুল তার রাজত্ব কায়েম করতে যাদেরকে প্রতিপক্ষ ভেবেছেন তাদেরকেই একেবারে শেষ করে দিতে চেয়েছেন। তার এমনই এক আক্রোশের শিকার ঢাকা গণপূর্ত শেরেবাংলানগর বিভাগ-৩ এর সদ্য সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম। বিগত সরকারের সময়ে ঢাকার তিনটি গুরুত্ব পূর্ণ ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করা প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম সাবেক দুই প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল আলম ও শামীম আখতারের আস্থাভাজন ছিলেন। বদরুল তাকে শায়েস্তা করতে জনৈক আমিরুল ইসলামকে দিয়ে মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করান মর্মে এই নারী জানান। এই নারী দাবি করেন বদরুল নিজে পিছন থেকে কল-কাঠি নেড়ে আতিককে লঘু দন্ড আরোপ ও মাগুরায় নিবর্তন মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করেন। এই নারী আরও জানান, তিনি আতিককে আরও বড় শাস্তি থেকে পরিত্রান দিতে ঐ নারীর মাধ্যমে বদরুল ২০ লক্ষ টাকা নেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে আতিক তার ড্রাইভার পরিচয়ে একজনের মাধ্যমে ঐ নারীর লোকের কাছে ২০ লক্ষ টাকা দেন, পরে ওই টাকা বদরুল নেন।
ওই নারী প্রতিবেদককে আরও বলেন, দুদক-এর সাবেক কমিশনার বদরুলের আত্মীয় হন বিধায়, তার প্রভাব খাটিয়ে ২১ তম বিসিএস এর কর্মকর্তা ত্বত্তাবধায়ক প্রকৌশলী (পিপিসি) জনাব এ কে এম সোহরাওয়ার্দী এর বিরুদ্ধে দূর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করান। পরে ঐ নারীকে দিয়ে ইংরেজী পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করেন। সোহরাওয়ার্দীকে ভয় দেখানোর সেই হোয়াটসঅ্যাপ-এর স্ক্রিনশটও ওই প্রবাসী নারী সাংবাদিক শেয়ার করেছেন। ঐ নারী দাবি করেন, তাকে ব্যবহার করে বদরুল আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে এবং অতর্বর্তী কালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ভয় দেখিয়ে কমপক্ষে ৩০০ কোটি টাকা আদায় করেছেন এবং বদরুলের কাছে নাকি এখন ২৫০ কোটি টাকা রয়েছে। ঐ নারীকে বদরুল স্টুডেন্ট ভিসায় অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে কোটি টাকা মানি লন্ডারিং করেছেন। অথচ বদরুল ভিকটিম কার্ড খেলে নিজেকে বিএনপিপন্থী হিসাবে বঞ্চিত দাবী করে প্রথমে সাভার সার্কেলে, পরে ঢাকা সার্কেল ১ এ বসেন। ভূক্তভোগী ঐ নারী বলেন যে তিনি অচিরেই বাংলাদেশে এসে স্ত্রীর স্বীকৃতির দাবীতে সংবাদ সম্মেলন করবেন।
এদিকে বদরুলেই হানি ট্র্যাপের বিষয়ে জানাজানি হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বদরুল সাবেক গণপুর্ত প্রধান শামীম আখতারকে সরিয়ে খালেকুজ্জামানকে প্রধান প্রকৌশলী করার জন্য ওপেন চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তার অনেকেই ধারণা করছে যে শামীম আখতারের মতো প্রভাবশালী একজনকে সরিয়ে খালেকুজ্জামানকে বসাতেও বদরুল হানি ট্র্যাপের আশ্রয় নিয়েছিলেন।
এবিষয়ে কথা বলতে প্রধান প্রকৌশলী মো খালেকুজ্জামানকে ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খানকে তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও প্রতিউত্তর দেননি।