জুবায়ের শেখ
প্রকাশ: ০১:০৭, ২২ জুলাই ২০২৬
বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবী থেকে নির্গত তাপের একটি বড় অংশ বায়ুমণ্ডলে আটকে যাচ্ছে। এই প্রাকৃতিক গ্রিনহাউস প্রভাব পৃথিবীতে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় হলেও অতিরিক্ত গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে উষ্ণতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ এই অবস্থাকে রূপক অর্থে পৃথিবীর গায়ে জড়িয়ে থাকা একটি ক্রমশ ভারী হয়ে ওঠা উষ্ণ চাদরের সঙ্গে তুলনা করছেন।
শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার, বনভূমি উজাড় এবং দ্রুত নগরায়নের ফলে কয়েক দশক ধরে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়েছে। এর প্রভাব শুধু গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, দীর্ঘ খরা, আকস্মিক বন্যা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো নানা পরিবর্তন এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরও ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। জলবায়ুবিদদের মতে, পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা একটি সমন্বিত কাঠামো হওয়ায় একটি অঞ্চলের পরিবর্তনের প্রভাব অন্য অঞ্চলও অনুভব করতে পারে।
বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ তাপপ্রবাহ, মৌসুমের বাইরে ভারী বৃষ্টিপাত, শীতের সময়কাল কমে আসা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তারের মতো ঘটনা বেড়েছে। কৃষি, স্বাস্থ্য, মৎস্য, পানি সম্পদ এবং অবকাঠামো খাত এসব পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবের মুখে পড়ছে। বিশেষ করে কৃষকেরা এখন আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মৌসুমি চাষাবাদের পরিকল্পনা করতে গিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বনভূমি কমে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক সক্ষমতাও কমছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্পকারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ আরও বাড়ছে। ফলে উষ্ণতা বৃদ্ধির চক্র আরও জোরালো হচ্ছে। নগরাঞ্চলে কংক্রিটের বিস্তার এবং সবুজের ঘাটতির কারণে তাপদ্বীপ প্রভাবও অনেক শহরে মানুষের কষ্ট বাড়িয়ে তুলছে।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, কৃষক, জেলে, দিনমজুর এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবীরা। অতিরিক্ত গরমে কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে এবং বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে পানির চাহিদা বাড়লেও অনেক এলাকায় নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানী ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ার ফলে পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটছে। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। তবে দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানো গেলে ভবিষ্যতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা সম্ভব।”
রাজশাহীর কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “এখন গরমের সময় মাঠে কাজ করা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। আবহাওয়ার আগের নিয়ম আর খুঁজে পাওয়া যায় না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বন সংরক্ষণ, নতুন বনায়ন, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিল্প খাতে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিকেও জাতীয় পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকরা। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা হওয়ায় এর কার্যকর সমাধানও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকদের মতে, পৃথিবীকে ঘিরে থাকা এই অদৃশ্য উষ্ণতার আবরণ ক্রমেই ঘন হচ্ছে, যার প্রভাব ইতোমধ্যে প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে। তবে পরিস্থিতিকে অপরিবর্তনীয় ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং সম্মিলিত বৈশ্বিক উদ্যোগের মাধ্যমে উষ্ণায়নের গতি কমিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা এখনো সম্ভব।