বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮:৫৭, ১৪ মে ২০২৬
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে কোটি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে দুদকের এক অভিযোগে পাওয়া গেছে। এছাড়াও জাল জালিয়াতি, কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্যসহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সেখানে।
অভিযোগপত্রে দেখা যায়, ডিপিপি বরাদ্দের নরসিংদী জেলা কারাগারের কাজ ঠিকাদার বিশ্বাস ট্রেডিং এন্ড কনস্ট্রাকশন-কে পাইয়ে দেন নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা। মুসার সাথে ঠিকাদারের বিশেষ চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারকে কাজ না করেই ৫ কোটি টাকা অগ্রীম বিল দিয়ে দিয়েছেন গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জুনে। অগ্রীম বিল পাওয়ার পরে সেই ঠিকাদার কাজ ফেলে পালিয়ে যায়। ফলে প্রকল্পটি এখন ঝুলে আছে। কারাগার সংস্থা ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে কাজ বাতিল করতে বাধ্য হন মুসা। সে মোতাবেক প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে কাজটি বাতিলও করা হয়। নিজের খাতিরের ঠিকাদারের সাথে অগ্রীম বিলের টাকা ভাগ বাটোয়ারা করার লোভে সেই বিলে নিয়ম মোতাবেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলী কারও স্বাক্ষর নেয়া হয়নি। হিসাব শাখাকে চাপ দিয়ে ভূয়া বিল এন্ট্রি দিতে বাধ্য করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মুসা।
এত বড় অনিয়ম করেও তিনি এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। শাস্তি তো হয়ইনি উল্টো প্রকল্প সমাপ্ত করতে রিমেইনিং কাজের প্রাক্কলন করে ডিপিপির অবশিষ্ট টাকা আত্মসাতের পায়তারা করছেন তিনি বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে।
বিধিমোতাবেক রিমেইনিং কাজের প্রাক্কলন পাস করতে হলে আগে যে ঠিকাদারের কাজ বাতিল করা হয়েছে তার পরিমাপ গ্রহণ করতে হবে, সেই পরিমাপ উভয় পক্ষের নিকট গ্রহণযোগ্য হলে, ঠিকাদারের পাওনা থাকলে তা পরিশোধ করতে হবে, আর যদি রাষ্ট্রের পাওনা থাকে তাও আদায় করে নিতে হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে রিমেইনিং কাজের প্রাক্কলন অনুমোদন করলে একই কাজের জন্য দুইবার বিল প্রদান করা হবে। তাতে জনগনের করের টাকার পাঁচ কোটি টাকা গচ্চা যাবে। যদিওবা অভিযোগ পাঁচ কোটি টাকা অগ্রীম বিল দেয়ার কিন্তু নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলী ও কর্মচারীর নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, নির্বাহী প্রকৌশলী মুসা বিশ্বাস ট্রেডিং এন্ড কন্সট্রাকশন কে প্রায় দশ কোটি টাকা অগ্রীম তথা ভূয়া বিল দিয়েছেন।
এছাড়াও অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে ঢাকা-সিলেট ৬ লেন প্রকল্পের অধিগ্রহনকৃত জমির উপরিস্থিত অবকাঠামোর মূল্য নির্ধারনে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, দোকান জায়গার মালিকদের কাছ থেকে প্রায় শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নির্বাহী প্রকৌশলী মুসা এপ্রিল-২০২৪ থেকে নরসিংদী ডিভিশনটির দায়িত্বে আছেন। এ সময়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে লে-আউট তৈরীসহ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বিভিন্ন শিল্প কল-কারখানা, দোকান, মার্কেট, বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নিরুপনে সার্ভে বা ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট তৈরীর নামে অধীনস্থ উপসহকারী প্রকৌশলী ইকরামুল হাসান ও আনোয়ারুল হকের মাধ্যমে প্রায় ২ শত কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।
অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ আছে যে এ এস এম মুসা নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন ধরণের উন্নয়ন মেরামত রক্ষণাবেক্ষণ কাজে পাতানো এলটিএমসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসা সহকারে বিভিন্ন প্রকৌশলীগত জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে বরাদ্দের বড় অংশ লোপাট করেছেন। আরো উল্লেখ আছে যে, প্রকৌশলী মুসা ডিভিশনটিতে পাতানো বা সাজানো এলটিএমের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়েছেন মোটা অংকের পার্সেন্টেজের বিনিময়ে। এজন্য অসংখ্য এলটিএম টেন্ডার আইডিতে মাত্র ৩টি করে সিডিউল বিক্রয়, রেসপন্স ও মূল্যায়ন দেখিয়েছেন। দৃষ্টান্ত স্বরূপ ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ১১২৫৬০৬, ১১২২৫৩৮, ১১২৫২১১, ১১২২৩০০, ১০৫০৪১৪, ১১১৭৯২৩ ও ১১২২৩১৭ নং এলটিএম আইডিগুলোতে মাত্র ৩টি করে সিডিউল বিক্রয়, রেসপন্স ও মূল্যায়ন দেখানো হয়েছে। অথচ সুষ্ঠুভাবে টেন্ডার লাইভে থাকলে একেকটি আইডিতে কমপক্ষে ৩০/৩৫টি সিডিউল বিক্রি হয় ডিভিশনটিতে। একইভাবে একই অর্থ বছরের ১০৭০০৬৫. ১০৬২৩৩৯, ১১২৫৫৯৩, ১১২৫৬০৭, ১১২৬০১৬ ও ১০৮১৩৬৮ নং এলটিএম টেন্ডার আইডিগুলোতে মাত্র ২টি করে সিডিউল বিক্রয় রেসপন্স ও মূল্যায়ন দেখানো হয়েছে। আবার একই অর্থবছরে ১০৬২৩৫৯, ১০৬৮১২৮, ১০৯৩৮৬৬, ১১১৭৯২৩, ১০৭৪৮৭৭, ১০৮১০৫২ ও ১১২১৪১৪ নং এলটিএম টেন্ডার আইডিগুলোতে মাত্র ১টি করে সিডিউল বিক্রয়, রেসপন্স ও মূল্যায়ন দেখিয়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও প্রকৌশলী মুসা জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্থ নরসিংদী জেলা কারাগার জজ কোর্ট ও আন্যান্য স্থাপনার জরুরী মেরামত ও পূণঃনির্মাণের নামে পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে আগে কাজ করিয়ে পরে ওটিএমের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়ে মোটা অংকের ঘুষ বাণিজ্য করে হাতিয়ে নিয়েছেন বরাদ্দের একটি বড় অংশ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ছয়লেন প্রকল্পের জন্য ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালের প্রধান গেট বাউন্ডারীওয়াল ও অভ্যন্তরীণ আরসিসি রাস্তা নির্মাণের নামে নির্বাহী প্রকৌশলী অধীনস্থ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে নিজেই ঠিকাদারী করে কয়েক লক্ষ টাকা লোপাট করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রযেছে।
আ’লীগের শেষ সময়ে এ এস এম মুসা ভোলা ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি আর লুটপাটের দায়ে অভিযুক্ত হন। ঢাকা থেকে ঠিকাদার ডেকে নিয়ে সেখানে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এলটিএম ওটিএম উভয় পদ্ধতিতেই কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন। ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার ও মেসার্স রাতুল এন্টপারপ্রাইজ নামক ঢাকার দুটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নামে নিজেই বেনামে ঠিকাদারী ব্যবসা করার কারণে সে সময়ে স্থানীয় ঠিকাদারদের হাতে তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়েছিলো। সে সময়ে ইনভেন্ট পয়েন্ট কম্পিউটার ভোলা ডিভিশনে লিষ্টেড না হলেও প্রকৌশলী মুসা নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই প্রতিষ্ঠানটিকে এলটিএম পদ্ধতিতে বেশ কয়েকটি কাজ পাইয়ে দেন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নরসিংদীর কতিপয় স্থানীয় ঠিকাদার জানান, প্রকৌশলী মুসা একজন চরম ঘুষখোড় পল্টিবাজ কর্মকর্তা। তার চাহিদা মতো পিসি না দিলে ডিভিশনটিতে কেউ কাজ পায় না। তার মতো দুর্নীতিবাজ লুটেরা প্রকৌশলী এই ডিভিশনে অতীতে কখনো আসেনি।
৩২ তম স্পেশাল বিসিএস এর মাধ্যমে ২০০ নম্বরের নৈবৃত্তিক পরীক্ষা দিয়ে বিসিএস ক্যাডার বনে যাওয়া এই কর্মকর্তা শুরু থেকেই অসৎ ও দূর্নীতি পরায়ন। ২৪ এর গণ অভ্যুত্থানে তিনি বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন। পরে ভোল পালটে সমন্বয়কদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে ঢাকা মহানগরীর কোন গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে পোষ্টিং বাগিয়ে নেয়ার জন্য জোড় তদবীর চালিয়ে যাচ্ছেন। এজন্য একজন ছাত্র উপদেষ্টার পেছনে ৩০ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন মর্মে জনশ্রুতি আছে।
এ বিষয়ে নরসিংদী গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসার মুঠো ফোনে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর দেননি।