৯ আশ্বিন ১৪৩৩ , সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬

নিম্ন আয়ের দেশের ঋণঝুঁকি কমাতে নতুন কাঠামো

ব্যাংকক বৈঠকে গুরুত্ব পাবে ঋণ ব্যবস্থাপনা

আল জাবের লিজয়

প্রকাশ: ০০:১৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিম্ন আয়ের দেশের ঋণঝুঁকি কমাতে নতুন কাঠামো

বিশ্বের নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণঝুঁকি, ঋণ টেকসইতা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায়। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিতব্য এই সভার আগে বৈশ্বিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে দুই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

গত ২১ সেপ্টেম্বর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী বোর্ড নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ টেকসইতা মূল্যায়নের যৌথ কাঠামো সংস্কারের অনুমোদন দিয়েছে। ২০১৭ সালের পর এটিই এই কাঠামোর প্রথম বড় পর্যালোচনা। নতুন কাঠামোতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা আরও বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামো ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে কার্যকর হওয়ার কথা।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এসেছে, যখন অনেক নিম্ন আয়ের দেশ উচ্চ ঋণ, সীমিত রাজস্ব এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাপের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর প্রায় ১৪ শতাংশ বর্তমানে ঋণ সংকটে রয়েছে এবং আরও ৩৩ শতাংশ দেশ উচ্চ ঋণঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

নতুন কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর বাড়তি নজর। এতদিন নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ মূল্যায়নে বৈদেশিক ঋণ ও বৈদেশিক মুদ্রায় দায়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু অনেক দেশে অভ্যন্তরীণ ঋণও দ্রুত বাড়ছে। ফলে কোনো দেশের সামগ্রিক ঋণ পরিস্থিতি বুঝতে সরকারি ঋণের সব উৎসকে আরও সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও নতুন কাঠামোর আওতায় আরও গুরুত্ব পাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু একই সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঋণের বোঝা বাড়তে পারে। নতুন কাঠামোতে এসব দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে।

ঋণ টেকসইতার নতুন কাঠামোর আরেকটি উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন দেশের ঝুঁকিকে আরও সূক্ষ্মভাবে আলাদা করা। সব উচ্চ ঋণগ্রস্ত দেশের ঝুঁকি এক নয়। কোনো দেশের ঋণের পরিমাণ বেশি হলেও যদি তার রাজস্ব আয়, রপ্তানি সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা শক্তিশালী হয়, তাহলে তার ঋণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অন্য দেশের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে। নতুন বিশ্লেষণী পদ্ধতির মাধ্যমে এ ধরনের পার্থক্য আরও ভালোভাবে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক একই সঙ্গে ঋণ সংক্রান্ত তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের দায় সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে একটি দেশের প্রকৃত ঋণঝুঁকি নির্ধারণ করা কঠিন হয়। তাই ঋণের তথ্য প্রকাশ ও প্রতিবেদন ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও নতুন কাঠামোর অংশ।

ব্যাংককের বার্ষিক সভায় এই পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুযায়ী ১৫ অক্টোবর Development Committee Meeting এবং ১৭ অক্টোবর International Monetary and Financial Committee বা আইএমএফসির পূর্ণাঙ্গ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এসব বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনীতি, উন্নয়ন অর্থায়ন ও আর্থিক স্থিতিশীলতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

ঋণ সংকটের পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতিও এবারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও কর্মসংস্থান খাতে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি অর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে বেসরকারি মূলধনকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের বার্ষিক কর্মসূচিতে ১৪ অক্টোবর উদীয়মান বাজারে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে একটি বিশেষ আয়োজন রয়েছে। এতে মূলধন বাজার, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন, গ্যারান্টি, ঝুঁকি কমানোর বিভিন্ন ব্যবস্থা এবং নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে কীভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হবে।

এদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ সমস্যা নিয়ে শুধু ঋণের পরিমাণ নয়, ঋণ ব্যবস্থাপনার কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক আলোচনায় দ্রুততর ও পূর্বানুমানযোগ্য ঋণ পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্যও বৈশ্বিক ঋণ পরিস্থিতির পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। বৈদেশিক ঋণের সুদ, পরিশোধের সময়সূচি, বৈদেশিক মুদ্রার আয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের পরিবর্তন দেশের উন্নয়ন ব্যয় ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

ফলে ব্যাংককের বৈঠকে ঋণ টেকসইতা ও উন্নয়ন অর্থায়নের আলোচনা শুধু সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য নয়, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে চাওয়া সব উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নতুন ঋণ কাঠামো এখনই কার্যকর হচ্ছে না। ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে তা কার্যকর হওয়ার কথা। তবে ব্যাংককের বার্ষিক সভা হতে পারে এই পরিবর্তনের বাস্তব প্রয়োগ, ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মতবিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণের চাপ যখন বাড়ছে এবং একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও উন্নয়ন ব্যয়ের চাহিদা বাড়ছে, তখন ঋণ ব্যবস্থাপনার নতুন কাঠামো কীভাবে দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন সক্ষমতাকে প্রভাবিত করবে, সেটিই ব্যাংকক বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন