১০ আশ্বিন ১৪৩৩ , সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬

গরিব-অসহায়ের পাশে মানবিক ডিসি নূরুল করিম

গাজীপুর প্রতিনিধ 

প্রকাশ: ১৭:৫৩, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গরিব-অসহায়ের পাশে মানবিক ডিসি নূরুল করিম

ছবি: সংগৃহীত

কারও হাতে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন, কারও মুঠোয় জমির কাগজ। কেউ এসেছেন স্বজনের নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে, কেউ আবার মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ার কষ্ট বুকে নিয়ে। কারও প্রয়োজন সরকারি ভাতা, কারও দরকার মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই। জীবনের নানা সংকট আর প্রত্যাশা নিয়ে প্রতি বুধবার গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হাজির হন জেলার বিভিন্ন এলাকার অসহায় মানুষ।

তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া। কারও সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন, আবার অসহায় মানুষের চিকিৎসা কিংবা জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় অনেককে দেওয়া হচ্ছে আর্থিক সহায়তাও।

জেলা প্রশাসনের এই গণশুনানি যেন অসহায় মানুষের জন্য নিজের কষ্ট বলার একটি দরজা খুলে দিয়েছে। যেখানে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ঘুরেও সমাধান পাননি, সেখানে সরাসরি জেলা প্রশাসকের কাছে নিজের সমস্যার কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।

সম্প্রতি পোশাকশ্রমিক সানিয়া আক্তার এসেছিলেন তার পঙ্গু বাবার চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে। সীমিত আয়ের পরিবারের পক্ষে বাবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই শেষ ভরসা হিসেবে তিনি হাজির হন গণশুনানিতে।

সানিয়ার কথা শুনে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তাকে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে তার বাবার চিকিৎসার বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

টঙ্গীর অসহায় বৃদ্ধা সামসুন্নাহারও এসেছিলেন চিকিৎসার জন্য। ব্রেস্ট ক্যানসারে আক্রান্ত এই নারী নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। গণশুনানিতে তার কষ্টের কথা জানালে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

এসব মানুষের গল্পে শুধু অসুস্থতার কষ্ট নেই, আছে সংসার চালানোর সংগ্রামও। নিম্ন আয়ের একটি পরিবারের কাছে বড় কোনো রোগ অনেক সময় পুরো পরিবারকে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। তখন চিকিৎসার পাশাপাশি খাবার, বাসাভাড়া ও সন্তানদের খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

এমনই আরেকটি সমস্যার কথা জানাতে গণশুনানিতে এসেছিলেন হালিমা আক্তার। স্বামী মারা যাওয়ার পর ভাসুর ও আত্মীয়দের সঙ্গে বিরোধে গৃহহীনসহ নানা সমস্যার মুখে পড়ার অভিযোগ করেন তিনি।

নিজের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি হালিমা। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তার সমস্যা দেখার জন্য সদর সার্কেলের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেন জেলা প্রশাসক।

গণশুনানিতে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, উঠে আসছে জনস্বার্থের নানা বিষয়ও। জমি অধিগ্রহণের বিল, মাতৃত্বকালীন ভাতা, কারখানার বকেয়া বেতন, সড়ক সংস্কার, নতুন ভূমি অফিস স্থাপন এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতো বিষয়ও রয়েছে অভিযোগের তালিকায়।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ সব অভিযোগ জেলা প্রশাসনের সরাসরি এখতিয়ারভুক্ত নয়। কোনোটি ভূমি অফিস, কোনোটি সমাজসেবা অধিদপ্তর, কোনোটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক দপ্তর আবার কোনোটি শ্রম বা স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

গণশুনানিতে সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ভাতা না পাওয়ার অভিযোগও আসে। প্রকৃত উপকারভোগী হয়েও তথ্যের ঘাটতি, ভুল নির্বাচন কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কেউ কেউ কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ করেন।

তবে গণশুনানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শুধু অভিযোগ শোনা বা তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেওয়া নয়; বরং অভিযোগের শেষ পরিণতি পর্যন্ত নজর রাখা। একজন মানুষ অভিযোগ করার পর তার সমস্যাটি আদৌ সমাধান হলো কি না, তিনি কাঙ্ক্ষিত সহায়তা পেলেন কি না—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন, জমি অধিগ্রহণের টাকা পাওয়ার জন্য কেউ আবেদন করলেন। শুনানিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো। এরপর আবেদনটি কোন পর্যায়ে গেল, কবে নিষ্পত্তি হলো কিংবা আবেদনকারী শেষ পর্যন্ত টাকা পেলেন কি না—এসব তথ্য জানা গেলে গণশুনানির কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট হবে।

একইভাবে চিকিৎসা সহায়তার ক্ষেত্রে শুধু তাৎক্ষণিক অর্থ দেওয়াই নয়, পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে পেরেছেন কি না, বকেয়া বেতনের অভিযোগে শ্রমিক সত্যিই বেতন পেয়েছেন কি না—এসব বিষয়েও নজর রাখা প্রয়োজন।

জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘মানুষের সমস্যা শুনে তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করা হয়।’

তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ তার নিজের অধিকার বুঝে পাবে।’

প্রশাসনিক কাঠামোয় সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে সেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকার একজন অসহায় মানুষ অনেক সময় জানেন না, তার সমস্যাটি নিয়ে কোথায় যেতে হবে, কার কাছে আবেদন করতে হবে কিংবা কোন আইনের আওতায় তিনি প্রতিকার পাবেন।

সেই জায়গায় জেলা প্রশাসকের গণশুনানি সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি যোগাযোগের একটি সুযোগ তৈরি করছে। একজন নাগরিক তার কষ্টের কথা সরাসরি জেলা প্রশাসকের সামনে বলতে পারছেন। একই সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

গণশুনানিতে উঠে আসা প্রতিটি অভিযোগ তাই শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়; এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠছে গাজীপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জীবনসংগ্রাম, সরকারি সেবা পাওয়ার বাস্তবতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্কের চিত্র।

তবে একজন অসহায় মানুষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে স্বস্তি নিয়ে ফিরবেন তখনই, যখন তার হাতে শুধু ‘ব্যবস্থা নেওয়ার’ আশ্বাস থাকবে না—বাস্তবে তার সমস্যারও সমাধান হবে।

গাজীপুরে প্রতি বুধবারের গণশুনানি ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের কথা বলার একটি সরাসরি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। এখন এর কার্যকারিতার পরবর্তী ধাপ হতে পারে—মানুষের কথা শোনার পাশাপাশি প্রতিটি অভিযোগের শেষ পরিণতি পর্যন্ত নজর রাখা।

কারণ একজন মানুষের কাছে তার অভিযোগটি হয়তো প্রশাসনের অসংখ্য ফাইলের একটি মাত্র বিষয়। কিন্তু সেই অভিযোগের পেছনে থাকতে পারে একটি পরিবারের চিকিৎসার আশা, মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার আকুতি কিংবা দীর্ঘদিনের কোনো বঞ্চনার কষ্ট।

আরও পড়ুন