২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ , অক্টোবর ১১, ২০২৬

তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’: যানজটমুক্ত ঢাকা গড়তে নাগরিকের হাতেই ডিজিটাল হাতিয়ার

মাহফুজ কবির মুক্তা

প্রকাশ: ১৯:৪৮, ১১ অক্টোবর ২০২৬

তারেক রহমানের ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’: যানজটমুক্ত ঢাকা গড়তে নাগরিকের হাতেই ডিজিটাল হাতিয়ার

ছবি: সংগৃহীত

আই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি; ফর মাই কান্ট্রি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে একটি যানজটমুক্ত, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

ঢাকার চিরচেনা যানজট, কর্মব্যস্ত মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন আর দীর্ঘ অপেক্ষা নগরবাসীর প্রতিদিনের জীবনের পরিচিত দৃশ্য। ট্রাফিক আইন অমান্য, লাল বাতি উপেক্ষা, অবৈধ পার্কিং কিংবা উল্টো পথে গাড়ি চালানোর মতো অনিয়ম এই দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ‘হ্যালো ডিএমপি’ (Hello DMP) মোবাইল অ্যাপে যুক্ত হওয়া ‘ট্রাফিক ভায়োলেশন রিপোর্টিং’ ফিচারের মাধ্যমে নাগরিকেরা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন। এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ সড়কে ঘটে যাওয়া অনিয়মের ভিডিও ধারণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর একটি পথ তৈরি হয়েছে।

স্মার্টফোনেই জানানো যাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের তথ্য:

গল্পের শুরুটা হয় এক সাধারণ চাকরিজীবী তরুণের হাত ধরে। প্রতিদিনের মতো সে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ সে দেখল, একটি গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে এবং আইন ভেঙে উল্টো পথে এগিয়ে যাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো মোড়ে তৈরি হলো বিশাল যানজট।

অন্য সময় হলে হয়তো তরুণটি কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন।

সে পকেট থেকে স্মার্টফোনটি বের করল। খুলল ‘হ্যালো ডিএমপি’ মোবাইল অ্যাপ। অ্যাপে নতুন যুক্ত হওয়া বিশেষ সুবিধা ‘ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ জানানোর’ অপশনে ক্লিক করে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই আইন লঙ্ঘনের একটি ছোট্ট ভিডিও ধারণ করল। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ভিডিওটি আপলোড হয়ে চলে গেল সরাসরি ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কাছে।

তরুণটির মনে হয়তো একটু সংশয় ছিল তার পরিচয় প্রকাশ পেয়ে কোনো ঝামেলা হবে না তো?

কিন্তু প্রযুক্তির নিরাপত্তা তাকে আশ্বস্ত করল। পুলিশ বিভাগ তার নাম ও পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখল। তথ্য প্রদানকারী নাগরিকের গোপনীয়তা নিশ্চিত করাই যে এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

ওদিকে, নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসা ট্রাফিক পুলিশের পর্দায় ভেসে উঠল সেই ভিডিও। কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে ডিজিটাল ট্রাফিক মামলা পরিচালনা সফটওয়্যারের মাধ্যমে অপরাধী যানবাহনটিকে শনাক্ত করা হলো।

প্রযুক্তির নিখুঁত ছোঁয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়ে গেল একটি ডিজিটাল মামলা, আর গাড়ির মালিকের ফোনে চলে গেল জরিমানার ই-নোটিশ।

কোনো তাৎক্ষণিক জরিমানা আদায় নয়, কোনো অনৈতিক প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই সবকিছু ঘটল সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডিজিটাল উপায়ে।

এই একটি মাত্র ঘটনা পুরো শহরের চিত্র বদলে দেওয়ার হাওয়া বইয়ে দিল। চালকরা এখন আর শুধু রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশকে ভয় পান না। তাঁরা জানেন, সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি সাধারণ নাগরিকই এখন একজন অদৃশ্য পরিদর্শক।

লাল বাতি অমান্য করা, অবৈধ পার্কিং কিংবা উল্টো পথে গাড়ি চালানোর মতো বিশৃঙ্খলাগুলো এক নিমেষেই উধাও হতে শুরু করেছে।

এভাবে নাগরিকের সরবরাহ করা তথ্য ট্রাফিক পুলিশের কাছে পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী সময়ে তথ্য যাচাই করে সংশ্লিষ্ট যানবাহন শনাক্তকরণ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর ফলে সড়কে আইন অমান্য করার ঘটনা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও কার্যকর হতে পারে।

এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তথ্য প্রদানকারী নাগরিকের পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা। নাগরিকেরা যাতে অনিয়মের তথ্য দিতে গিয়ে অযাচিত হয়রানির আশঙ্কায় না ভোগেন, সে জন্য গোপনীয়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি

ট্রাফিক আইন প্রয়োগে প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু অনিয়ম শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সুযোগও তৈরি করে।

ডিজিটাল ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট যানবাহন শনাক্তকরণ, তথ্য যাচাই এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালিত হতে পারে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ডিজিটাল মামলা ও জরিমানার ই-নোটিশ ব্যবস্থাও এ প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে।

এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো আইন প্রয়োগকে আরও নিয়মতান্ত্রিক করা, যাতে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযোগের যথাযথ যাচাই, প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা এবং নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও নাগরিক অংশগ্রহণের সমন্বয় কার্যকর হলে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকেরাও অনিয়ম প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারবেন। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে ব্যবস্থাটির কার্যকর প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর।

টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ থেকে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

গত দুই দশকে তারেক রহমান দেশের জনগণ ও বাংলাদেশকে বদলে দেওয়ার যে রাজনৈতিক লড়াই শুরু করেছিলেন, তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল । সেই পরিবর্তনের প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ এখন জোরেশোরে এগিয়ে চলছে ।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন শুধু কাগজে-কলমে কিংবা বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিষয় নয়। বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, নাগরিক সেবা সহজ করা এবং জনদুর্ভোগ কমানোর মধ্য দিয়েই পরিকল্পনার বাস্তব সার্থকতা প্রকাশ পায়।

ঢাকার যানজট নিরসন সেই প্রত্যাশার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রতিদিন যানজটে আটকে থাকা মানুষের সময় বাঁচানো, ট্রাফিক আইন কার্যকর করা এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নগরজীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে।

এ জন্য শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, নির্ধারিত স্থানে গাড়ি পার্ক করা, উল্টো পথে যানবাহন না চালানো এবং সড়কে অন্যের চলাচলের অধিকারকে সম্মান করার মতো নাগরিক দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের অংশগ্রহণেই পরিবর্তনের বাস্তবায়ন

একটি দেশের উন্নয়ন ও পরিবর্তনকে টেকসই করতে সরকারের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সরকার উদ্যোগ নেবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পালন করবে এবং নাগরিকেরা সচেতনভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন এই সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে ওঠে।

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের তথ্য জানানোর ডিজিটাল সুবিধা নাগরিকদের সেই দায়িত্ব পালনের একটি সুযোগ করে দেয়। সড়কে কোনো অনিয়ম দেখলে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো, নিজে আইন মেনে চলা এবং অন্যদেরও আইন মানতে উৎসাহিত করার মাধ্যমে নাগরিকেরা পরিবর্তনের অংশ হতে পারেন।

একইভাবে সরকারের গৃহীত উদ্যোগের কার্যকারিতা মূল্যায়ন, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি তোলাও নাগরিক অংশগ্রহণের অংশ। কারণ জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি তার বাস্তবায়ন ও ফলাফল মূল্যায়নও জরুরি।

বিএনপি সরকার জনগণের সরকার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং জনগণকে পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব দেখবে এক নতুন বাংলাদেশ

একটি যানজটমুক্ত, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিকসমাজ। ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের একটি সম্ভাবনাময় দিক।

তবে কোনো পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার বাস্তব ফলাফলের ওপর। মানুষের দুর্ভোগ কতটা কমছে, সড়কে আইন কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে এবং নাগরিকেরা কতটা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে চলাচল করতে পারছেন এসবের মধ্য দিয়েই পরিবর্তনের সাফল্য পরিমাপ করা সম্ভব।

তারেক রহমানের ‘I have a plan’—এই প্রত্যয়কে বাস্তবে রূপ দিতে হলে জনগণকে সচেতন হতে হবে, পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকতে হবে। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি উন্নত, আধুনিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা বাস্তব রূপ পেতে পারে।

পরিকল্পনা যখন মানুষের কল্যাণে বাস্তবায়িত হবে, নাগরিক অংশগ্রহণ যখন পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হবে এবং উন্নয়নের সুফল যখন সাধারণ মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হবে, তখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। বিশ্ব দেখবে এক নতুন বাংলাদেশ যে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার কেন্দ্রে থাকবে দেশের মানুষ।

মাহফুজ কবির মুক্তা
প্রেস কর্মকর্তা
ইশরাক হোসেন, এমপি ও প্রতিমন্ত্রী
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

আরও পড়ুন