১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ , সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার বিচারিক সঠিকতা: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

সৈয়দ সাফিউল হাসান চিশতী

প্রকাশ: ১৫:৫৬, ১৩ আগস্ট ২০২৬

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার বিচারিক সঠিকতা: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

ছবি: সংগৃহীত

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর পরিবারসহ নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । এই হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পরিবারের বিনাশ ছিল না, বরং তা ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রা ও আইনের শাসনকে ধূলিসাৎ করার এক ঘৃণ্য প্রচেষ্টা । 

দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ২০১০ সালে চূড়ান্ত রায়ের মধ্য দিয়ে এর একটি আংশিক সমাপ্তি ঘটে । এই বিচার প্রক্রিয়ার সঠিকতা, আইনি বৈধতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।আইনের একজন ছাত্র হিসেবে বিষয়টির তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে অনেকগুলো বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি | পুরো লেখা জুড়ে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি |

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের সঠিকতা যাচাই করতে হলে প্রথমেই যে আইনি প্রতিবন্ধকতাটি আলোচনা করা প্রয়োজন তা হলো 'ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৫ । ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমেদ এই অধ্যাদেশ জারি করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান এবং হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা প্রদান করা । এটি বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন 'কালো আইন' হিসেবে পরিচিত, কারণ এর মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবারের বিচার চাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স ছিল আইনের শাসনের পরিপন্থী । মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'-এর মতে, এটি ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরির প্রথম ধাপ। সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে এই অর্ডিন্যান্সকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়। আইনি বিশেষজ্ঞ বিমলেন্দু বিকাশ রায় চৌধুরী মনে করতেন, সংবিধানের এই ধরনের অপব্যবহার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১২ নভেম্বর 'ইনডেমনিটি (বাতিল) আইন' পাস করে। এই বাতিলের সঠিকতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিশেষ করে 'জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট ১৮৯৭'-এর ধারা ৬-এর দোহাই দিয়ে বলা হয়েছিল যে, পুরনো আইনের আওতায় প্রাপ্ত কোনো সুবিধা নতুন আইনের মাধ্যমে বাতিল করা যায় না।

তবে প্রথিতযশা আইনজ্ঞ এবং অ্যামিকাস কিউরিদের মতে, সংসদ তার সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করে যেকোনো আইন ভূতাপেক্ষভাবে বাতিল বা পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে । বিশেষ করে যখন কোনো আইন প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হয়, তখন তা বাতিল করা কেবল আইনি নয়, বরং নৈতিকভাবেও সঠিক । অ্যামিকাস কিউরি রোকনউদ্দিন মাহমুদের মতে, ইনডেমনিটি বাতিলের মাধ্যমে সংবিধানের মূল চেতনা—অর্থাৎ আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার—পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল প্রচলিত ফৌজদারি আইনে, কোনো বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নয় । এটি বিচার প্রক্রিয়ার সঠিকতা প্রমাণের একটি অন্যতম বড় ভিত্তি। বঙ্গবন্ধু হত্যার মামলা দায়ের হয় ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায়। মামলা নম্বর ছিল ধানমন্ডি থানার মামলা নং ৩৪/১৯৯৬। পরবর্তীতে এটি সেশন জজ আদালত, ঢাকা-তে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর ঢাকার দায়রা জজ আদালত ১৫ জন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন ।

বিচারিক সঠিকতার খাতিরে মামলাটি এরপর উচ্চতর আদালতের যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়।

উচ্চ আদালত এবং আপিল বিভাগের দীর্ঘ শুনানিতে প্রতিটি অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল ।

হাইকোর্টের ২০০৯ সালের Criminal Appeal Nos. 15–21 of 2001 (High Court Division) রায়ে ১২ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

আপিল বিভাগ ২০১০ সালের রায়ে Criminal Appeal Nos. 16–21 of 2009 (Appellate Division, Supreme Court of Bangladesh) হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে।

অ্যামিকাস কিউরি রফিক-উল হক উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় আপিল বিভাগ হলো চূড়ান্ত ন্যায়বিচারের স্থান এবং এই মামলার ক্ষেত্রেও আইনি সকল ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে । ২০০১ সালে হাইকোর্ট ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন এবং ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত রায়ের পর পাঁচজনের দণ্ড কার্যকর করা হয় । এই দীর্ঘসূত্রতা এবং ধাপে ধাপে বিচার বিশ্লেষণ এটিই প্রমাণ করে যে, রায়টি আবেগ তাড়িত ছিল না, বরং তা ছিল অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ।মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া মূলত কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এগোচ্ছিল।। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অন্যান্য দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ  অনুরোধও পাঠিয়েছিল।। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘসূত্রিতায় পড়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিতদের দৃষ্টিতেও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক উইলিয়াম শাবাস মনে করেন, যখন কোনো রাষ্ট্রে অত্যন্ত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে, তখন রাষ্ট্র সেই অপরাধের বিচার করতে বাধ্য । বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হওয়া ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং আইসিসিআইপিআর (ICCPR)-এর লঙ্ঘন ।

আইনি বিশেষজ্ঞ এবং অ্যামিকাস কিউরি এম. আমীর-উল ইসলামের মতে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের চেতনা এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ এই ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে । তাঁর মতে, কোনো অপরাধ যখন মানবতাবোধকে আঘাত করে, তখন প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হলো আদালতের প্রধান কাজ ।

অন্যদিকে, বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ঘটনাটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের মূল ভিত্তিগুলোতে আঘাত করা । ঘাতকদের একজন, আব্দুল মাজেদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক ষড়যন্ত্র কাজ করেছিল। 

এই ধরনের প্রেক্ষাপটে বিচার বিভাগীয় নিরপেক্ষতা বজায় রেখে রায় প্রদান করা ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ, যা বাংলাদেশের উচ্চ আদালত সফলভাবে সম্পন্ন করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

এই আইনী লড়াইয়ে ফৌজদারী কার্যবিধির ধারা ৩০২ হত্যাকাণ্ডের শাস্তি—মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ধারা ৩৭৪ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন, ধারা ৩৬৬  মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়া, ধারা ৪২৩ আপিলের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ক্ষমতা, ধারা ৪৩৯ হাইকোর্টের পুনর্বিবেচনার ক্ষমতার প্রয়োগ হয়েছে। এছাড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান, অনুচ্ছেদ ৩১ আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার, অনুচ্ছেদ ৪৪  মৌলিক অধিকার প্রয়োগের জন্য হাইকোর্টে আবেদন,  অনুচ্ছেদ ১১১  সুপ্রিম কোর্টের রায় সকল আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক, এই অনুচ্ছেদগুলো আইনী বিবেচনায় সামনে এসেছে।

যদিও আইনিভাবে এই বিচারের সঠিকতা প্রশ্নাতীত, তবুও কিছু রাজনৈতিক মহল থেকে একে 'রাজনৈতিক প্রতিহিংসা' হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা হয়েছে । বিশেষ করে দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিচারের উদ্যোগ নেওয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা হয়েছে । তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তির বিপক্ষে বলেছেন যে, ফৌজদারি অপরাধে বিচারের ক্ষেত্রে কোনো তামাদি বা সময়সীমা নেই । 

অ্যামিকাস কিউরি মাহমুদুল ইসলামের মতে, যদি অপরাধের গুরুত্ব অত্যধিক হয় এবং পূর্ববর্তী সরকারগুলো বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে রাখে, তবে সময়ের দোহাই দিয়ে অপরাধীকে ক্ষমা করার কোনো সুযোগ নেই । এছাড়া, অনেক ঘাতক বিদেশের মাটিতে পালিয়ে থাকায় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজেদের অপরাধের গর্ব করায় তাঁদের বিচারিক দায়বদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার বিচারিক সঠিকতা কেবল আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং একটি জাতির নৈতিক পুনর্জাগরণের জন্য অপরিহার্য ছিল।

ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্সের মতো একটি কালো আইন বাতিল করে প্রচলিত আইনের অধীনে প্রকাশ্য আদালতে এই বিচার সম্পন্ন করা বিচার বিভাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত ।
বিশেষজ্ঞ আইনজ্ঞদের সুচিন্তিত মতামত এবং আদালতের দীর্ঘ বিচারিক বিশ্লেষণ এটিই নিশ্চিত করে যে, এই মামলার রায় ছিল স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত এবং আইনসিদ্ধ । এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে, কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো সভ্য সমাজে চিরস্থায়ী হতে পারে না । পরিশেষে বলা যায়, এই বিচার প্রক্রিয়ার সঠিকতা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।

লেখক ,আহবায়ক , চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ
ইমেইল:[email protected]

আরও পড়ুন