৭ কার্তিক ১৪৩৩, অক্টোবর ২৩, ২০২৬

সুবিধাবঞ্চিতদের বাজেট: ২০২৬-২৭

সৈয়দ সাফিউল হাসান চিশতী

প্রকাশ: ১৫:১৮, ১১ জুলাই ২০২৬

সুবিধাবঞ্চিতদের বাজেট: ২০২৬-২৭

ছবি: সংগৃহীত

একটি রাষ্ট্র তখনই প্রকৃত অর্থে উন্নত এবং মানবিক হয়ে ওঠে, যখন তার উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছায়। বাংলাদেশের সংবিধানে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত । দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী—বাংলাদেশে বেদে, দলিত, হরিজন, তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজরা জনগোষ্ঠী, ঋষি, কামার , কুমোর, ডোম, বেলোয়ার, বস্তিবাসী, নাপিত, ধোপা,  হাজাম সহ অন্যানরা এবং বস্তিবাসী এবং নিম্নতম মজুরির অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক, নিম্নতম মজুরির পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট লোকজন অপ্রথাগত রিক্সা শ্রমিক, ভ্যান শ্রমিক, অটোরিক্সার শ্রমিক, হেলপার, ফেরি করে কম মূল্যের পণ্য বিক্রেতা, রেলস্টেশনের কুলি দিনমজুর ,চা পান বিক্রেতা, এতিম প্রভৃতি এরাই অনগ্রসর । মূলধারার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা চরম অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে ।

আমি সৌভাগ্যবান অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সাথে খুব কাছাকাছি থেকে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাদের অর্থনীতি ও সামাজিক কার্যক্রম, প্রথা, আচার,ভাষা, পেশার বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এ বিষয়গুলোর সম্যক ধারণা পেয়েছি। লেখালেখির কারণে, সাংগঠনিক কারণে আমি ও কাশেম ভাই ( মোহাম্মদ আবুল কাশেম,সভাপতি, অগ্নিবীণা সমাজ কল্যাণ সংস্থা কুমিল্লা) এবং সংগঠনের অন্যান্যদর সংশ্লিষ্টতায় প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ,ঈদ ,করোনা, আইনি সহায়তা এসব বিষয়ে একসাথে কাজ করেছি। 

বাজেট সম্পর্কিত আলোচনায় অনগ্রসরদের এ বিষয়টিতে কয়েকটি ইস্যু যেমন দৈনন্দিন জীবনধারণ, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এসব বিষয়ে নজর দেয়া জরুরী ।

অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৫৮ লাখ হলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এই সংখ্যা এক কোটিরও বেশি । দলিত ও হরিজন সম্প্রদায়ের বাইরেও অসংখ্য পেশাজীবী এবং প্রান্তিক মানুষ রয়েছে যারা অত্যন্ত নিম্ন মজুরিতে জীবন নির্বাহ করে। বিশেষ করে তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন; তারা অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবেই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকেও বঞ্চিত থাকে । নীতিমালা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কুমিল্লা ও ঢাকার মতো অনেক জায়গায় বেদে, হিজড়া, হরিজনরা মাসের পর মাস ভাতা পায়নি, পাচ্ছেনা বা তাদের সন্তানরা উপবৃত্তি পাচ্ছেনা এ নজিরও আছে। 

২০২৬-২৭ বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও বরাদ্দ সাম্প্রতিক ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে মোট ১,৪৪,৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৫.৩৯% এবং জিডিপির ২.১১% এই বাজেটের উল্লেখযোগ্য কিছু বরাদ্দ ও কর্মসূচি হলো:

১. ফ্যামিলি কার্ড প্রোগ্রাম (ফ্ল্যাগশিপ উদ্যোগ): এটি এই বাজেটের সবচেয়ে বড় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ। ৪১ লাখ সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের নারী প্রধানদের প্রতি মাসে সরাসরি ২,৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে । ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে 'ইউনিভার্সাল সোশ্যাল আইডি' হিসেবে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। 

২. অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন: হিজড়া, বেদে ও দলিতদের জন্য এই কর্মসূচির আওতায় ২৩৪.৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে ২.৭৯ লাখ মানুষ উপকৃত হবেন । 

৩. ভাতা বৃদ্ধি: সাধারণ বয়স্ক এবং বিধবা ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে। তবে বিশেষ বিবেচনায় ৯০ বছরের ঊর্ধ্বের বয়স্কদের জন্য এই ভাতা বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছে । 

৪. শিক্ষা উপবৃত্তি: অনগ্রসর ও বেদে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে উচ্চতর পর্যায়ে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত উপবৃত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে ।

ফ্যামিলি কার্ড ছাড়া বাকী বিষয়গুলো আগে থেকেই চলে আসছে। বাজেটে বরাদ্দ বাড়লেও মাঠপর্যায়ে সুবিধাবঞ্চিতরা বেশ কিছু কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে: টার্গেটিং ত্রুটি :এটি সামাজিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় কলঙ্ক। গবেষণায় দেখা গেছে, সুবিধাভোগীদের প্রায় ৬২.৮% প্রকৃতপক্ষে দরিদ্র বা অনগ্রসর নয় । অন্যদিকে, বিধবা ভাতার ক্ষেত্রে যোগ্য নারীদের ৮৫% এবং প্রতিবন্ধী ভাতার ক্ষেত্রে ৭৫.৫% যোগ্য ব্যক্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছেন । তালিকায় নাম তুলতে 'স্পিড মানি' বা ঘুষের আধিপত্য প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ পড়ার অন্যতম কারণ ।

মূল্যস্ফীতির থাবা: বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে মাসে ৭০০ বা ৮৫০ টাকা ভাতা অত্যন্ত নগণ্য । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভাতার পরিমাণ বাজারের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অনেক কম ।

নগর দরিদ্রদের অবহেলা: বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও মূলত গ্রামকেন্দ্রিক। নগরায়ন ও বস্তিবাসীদের সংখ্যা বাড়লেও মোট সুবিধাভোগীর মাত্র ২০% শহর এলাকার।

বাজেটের কৃত্রিম স্ফীতি: সামাজিক নিরাপত্তার বাজেটের প্রায় ৪৩.২% খরচ হয় সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ও কৃষি ভর্তুকিতে, যা সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে বা অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজে আসে না।

ডিজিটাল পদ্ধতি: টার্গেটিং ত্রুটি কমানোর হাতিয়ার সুবিধাবঞ্চিতদের প্রকৃত অধিকার নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি কমাতে বাজেটে বেশ কিছু ডিজিটাল ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়েছে । যেমন ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি  একটি রিয়েল-টাইম তথ্য হালনাগাদের পদ্ধতি । এর মাধ্যমে নাগরিকরা যেকোনো সময় অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন এবং প্রশাসনিক ডেটাবেজের সাথে সংযোগ থাকায় আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থা তৎক্ষণাৎ যাচাই করা সম্ভব হবে । 

সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মসূচিগুলোকে একটি কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডারে নিয়ে আসে যাতে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা না পায় । 

প্রক্সি মিনস টেস্ট একটি বৈজ্ঞানিক স্কোরিং পদ্ধতি যেখানে পরিবারের দৃশ্যমান সূচক (যেমন- ঘরের ধরন, গবাদি পশু, বিদ্যুৎ ব্যবহার) দেখে দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়। এটি স্থানীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে সুবিধাভোগী নির্বাচনে সহায়তা করে । 

ফ্যামিলি কার্ডে 'ফ্যামিলি ট্রি' প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের ডিজিটাল পারস্পরিক সম্পর্ক এবং তাদের জীবনচক্রের পরিবর্তনগুলো ট্রাক করা হবে, ফলে অযোগ্য সদস্যদের তালিকায় থাকার সুযোগ কমবে । 
জিটুপি পেমেন্ট হওয়ায় সরাসরি ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর ফলে মাঝপথে টাকা আত্মসাৎ বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়েছে ।

তবে সংকট থেকে  উত্তরণের জন্য অনেকদিন ধরে কাজ করা এ বিষয়গুলো যথেষ্ঠ নয় । 

ভাতার পরিমাণ বার্ষিক ভোক্তা মূল্য সূচকের (CPI) সাথে সমন্বয় করে নিয়মিত বৃদ্ধি করা প্রয়োজন যাতে এর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বজায় থাকে।

নগর দরিদ্র ও বস্তিবাসীদের জন্য জীবনচক্র-ভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা জরুরি। বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলোতে বিধবা ও বয়স্ক ভাতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

উৎপাদনশীল অন্তর্ভুক্তি শুধুমাত্র নগদ সহায়তা না দিয়ে হিজড়া বা দলিত জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষম ব্যক্তিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণ দেয়া কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে।
হিজড়াদের ক্ষেত্রে বয়সের সীমা কমিয়ে ২০ বছরে নিয়ে আসা এবং প্রতিবন্ধী ভাতার ক্ষেত্রে আয়ের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়ে সর্বজনীন সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত ।

এতিমদের ক্ষেত্রে মাসিক অনুদান ২০০০ টাকা। তবে এক্ষেত্রে মোট এতিমের ৫০ ভাগকে অনুদানভুক্ত করা হয়। গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে এতিমদের উপকারভোগীর সংখ্যা কমেছে। তবে তাদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ বাবদ কোন বরাদ্দ নেই। গ্রান্টের পরিমাণ যদি একই থাকে, উপকারভোগীর সংখ্যা শতভাগ বৃদ্ধি করা হোক, পিতৃহীন, মাতৃহীন, পিতৃমাতৃহীন এসব এতিমদের, অনাথদের সবাইকেই গ্র্যান্টের আওতায় আনা হোক। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণোত্তর সহায়তা খাতে বরাদ্দ দেয়া হোক।

অপ্রথাগত অনগ্রসর যারা যেমন রিক্সাওয়ালা,চাপান বিক্রেতা, কুলি,দিনমজুর ফেরিওয়ালা প্রভৃতি নিম্নতম মজুরির, অর্থনীতিতে তাদেরও কিন্তু অবদান রয়েছে। এখন রিক্সাওয়ালাদের ক্ষেত্রে তাদের দৈনন্দিন জমা বেড়েছে ৬০ টাকার জমা রিক্সা এখন ১৩০ টাকা ১৫০ টাকা দিতে হয়। অটোরিক্সায় ৪০০/ ৫০০ টাকা জমা দিতে হয় প্রতিদিন। এমতাবস্থায় মাস শেষে সব খরচের পর তাদেরকে আর্থিক দৈন্যতার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে। ভ্যানচালকেরাও ব্যতিক্রম নয়, আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরদার অথবা দালালদের দিতে হচ্ছে। কুলি, দিনমজুর, গৃহকর্মী, হেলপারদের কাজ না থাকলে বসে থাকতে হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির সংকটে চা পান বিক্রেতা, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাল মেলাতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে তাদের জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নেয়া যায়। যেমন টিসিবি পণ্য বিক্রয়ে তাদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রাখা অথবা অগ্রাধিকার দেয়া বা কৃষিকার্ডে বিশেষ ব্যাবস্থা রাখা। 

সার্বজনীন উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে তাদের সন্তানদের কারিগরি, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের জন্য অগ্রাধিকার দেয়া, সব ধরনের শিক্ষা উপকরণ ফ্রি দেয়া, সব ধরনের বেতন ফি মওকুফ করা। চাপান বিক্রেতা, ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ীদের বিনা সুদে ঋণ দেয়া, অসুস্থ বার্ধক্য অবস্থায় বিশেষ ভাতার ব্যাবস্থা করা। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য বেকারত্ব বিমা বা মাতৃত্বকালীন বিমার মতো উদ্ভাবনী ব্যবস্থা চালু করা।

বাংলাদেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কেবল দয়া বা করুণার বিষয় নয়, এটি তাদের সাংবিধানিক অধিকার । ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে যদি কাজ করা যায় তবেই বঞ্চিত দলিত, হিজড়া এবং প্রান্তিক শ্রমিকরা উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত হতে পারবে। ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমিয়ে একটি সুষম ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দকে আরও সুসংহত ও লক্ষ্যভিত্তিক করা এখন সময়ের দাবি। 

লেখক, সাধারন সম্পাদক, অগ্ণিবীণা সমাজকল্যান সংস্থা কুমিল্লা
মোবাইল:০১৫৫৪১১৭৪২২
ইমেইল:[email protected]

আরও পড়ুন