মো. শাহজাহান
প্রকাশ: ২৩:৩৪, ২৩ মে ২০২৬
ফাইল ছবি
রাজধানী ঢাকা এখন এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে মাটির ওপরের ধুলো আর ধোঁয়া যতটা দৃশ্যমান, মাটির নিচের নিঃশব্দ হাহাকার ততটাই আড়ালে। একটি নগরী যখন তার প্রাণশক্তির জন্য পুরোপুরি মাটির গভীর স্তরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার ভবিষ্যৎ যে কেবল ধূসর নয় বরং ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রতিদিন আমরা যখন কল ছাড়লেই স্বচ্ছ পানি পাই, তখন একবারও ভাবি না যে এই পানির প্রতিটি ফোঁটা আমাদের পাতালপুরীর শেষ সম্বলটুকু কেড়ে নিচ্ছে। ঢাকা ওয়াসা দৈনিক যে শত শত গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করছে, তাতে প্রতি বছর পানির স্তর দুই থেকে তিন মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে।
এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি একটি অশনিসংকেত যে আমাদের পায়ের নিচের মাটি ক্রমেই শূন্য হয়ে পড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর এই অতিমাত্রায় অতিনির্ভরশীলতা আমাদের ভূ-উপরস্থ পানির যথাযথ ব্যবহার থেকে বিমুখ করে রেখেছে, যার ফলে নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা আজ পানের অযোগ্য বিষাক্ত নদীর তীরে বসে তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো আকাশপানে বা মাটির গভীরে চেয়ে আছি। মাটির নিচে যে প্রাকৃতিক জলাধার বা অ্যাকুইফার থাকে, তা বৃষ্টির পানি বা ভূ-উপরস্থ উৎস থেকে পুনরায় পূর্ণ হওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া রয়েছে।
কিন্তু ঢাকা শহর আজ কংক্রিটের এক নিরেট অরণ্যে পরিণত হয়েছে। চারদিকে সুউচ্চ ভবন, পিচঢালা পথ আর সিমেন্টের আচ্ছাদন বৃষ্টির পানিকে মাটির গভীরে চুইয়ে পড়ার কোনো পথ রাখেনি। ফলে আমরা কেবল তুলেই যাচ্ছি, বিনিময়ে প্রকৃতিকে কিছুই ফেরত দিচ্ছি না। পানি বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘ওয়াটার মাইনিং’ বা পানি খনন, যা একবার শেষ হয়ে গেলে পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। বর্তমানে ঢাকা ওয়াসা তার সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি পানি মাটির নিচ থেকে উত্তোলন করে, যা কোনোভাবেই একটি আধুনিক মেগাসিটির জন্য টেকসই মডেল হতে পারে না।
নদীকে আমরা জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করি, যার প্রাণ আছে এবং যার স্পন্দনে গড়ে ওঠে মানবসভ্যতা। কিন্তু ঢাকার চারপাশের নদীগুলো আজ মৃতপ্রায়। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ বা শীতলক্ষ্যার যে কালো কুচকুচে পানি আমরা দেখি, তা মূলত আমাদেরই অবহেলার ফসল। এই দূষণের কারণেই নদীবেষ্টিত হয়েও আমাদের কয়েক শ কিলোমিটার দূর থেকে পদ্মা বা মেঘনার পানি শোধন করে আনতে হচ্ছে। ওয়াসা সায়েদাবাদ, গন্ধর্বপুর বা পদ্মার মতো বিশাল সব প্রকল্প হাতে নিলেও তা ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। বর্তমানে ঢাকায় দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৩১৫ কোটি লিটার, যার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৯৮ কোটি লিটারের মতো।
এই বিপুল পরিমাণ পানির সিংহভাগই আসছে হাজারেরও বেশি গভীর নলকূপের মাধ্যমে। এই অতিনির্ভরতা কেবল পরিবেশগত ঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি অর্থনৈতিকভাবেও আমাদের পঙ্গু করে দিচ্ছে। মাটির গভীর থেকে পানি তুলতে গিয়ে ওয়াসার বিদ্যুৎ খরচ ও কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহককে। সম্প্রতি পানির দাম বৃদ্ধি তারই একটি উদাহরণ মাত্র। অথচ সমাধানের পথ ছিল নদীর পানিকে সচল রাখা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে মাটির নিচের জলাধারগুলোকে রিচার্জ করা।
কিন্তু পরিকল্পনা মাফিক কাজ না হওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যারা একদিকে দূষিত পানি আর অন্যদিকে উচ্চমূল্য নিয়ে দিশেহারা। ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর পানির জন্য হাহাকার যেন একই সূত্রে গাঁথা—ভুল উন্নয়ন কৌশলের ফল। নগরবাসী বলছেন, ওয়াসার পানি সরাসরি পান করা তো দূরের কথা, ফুটিয়েও অনেক সময় গন্ধ বা ময়লা দূর করা যাচ্ছে না। এটি একটি জনস্বাস্থ্য সংকটের দিকেও আমাদের ঠেলে দিচ্ছে।
বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, পানির স্তর নেমে যাওয়ার সমস্যা কেবল আমাদের একার নয়, কিন্তু অন্য দেশগুলো যে দ্রুততায় ব্যবস্থা নিয়েছে আমরা সেখানে অনেক পিছিয়ে।
উদাহরণস্বরূপ, মেক্সিকো সিটি বা ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার কথা বলা যেতে পারে। জাকার্তা শহরটি ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে প্রতি বছর কয়েক সেন্টিমিটার করে দেবে যাচ্ছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের রাজধানী পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ব্যাংককও এক সময় একই সংকটে পড়েছিল, কিন্তু তারা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করে এবং শিল্পকারখানার জন্য সারফেস ওয়াটার বা ভূ-উপরস্থ পানির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে পরিস্থিতি কিছুটা সামলেছে। জাপানের টোকিও শহর এক সময় ভূগর্ভস্থ পানি তোলার কারণে দেবে যাচ্ছিল, কিন্তু গত কয়েক দশকে তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং মাটির নিচে পানি পুনরায় প্রবেশ করানোর প্রযুক্তিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
অথচ আমরা ঢাকা শহরে একের পর এক গভীর নলকূপ স্থাপনে বেশি আগ্রহী হচ্ছি, যা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের নামান্তর। পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে অনাপত্তিপত্রের কথা বললেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটুকু তা প্রশ্নসাপেক্ষ। রাজউক বা স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিকল্পনার সঙ্গে ওয়াসার সমন্বয়হীনতা আমাদের একটি বড় অন্ধকার গহ্বরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের ফেলো মোহাম্মদ আমিনুর রসুল বাবুল বা অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদারের মতো বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেই বলছেন যে, আমাদের জলাধার ধ্বংস করা, পুকুর ভরাট এবং খালগুলো দখল-দূষণ করার কারণেই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাটির ওপরের উন্মুক্ত মাটি না থাকলে পানি চুইয়ে নিচে যাবে কীভাবে? ঢাকার আশপাশের জলাভূমিগুলো যদি আমরা রক্ষা করতে পারতাম, তবে সেগুলো স্পঞ্জের মতো কাজ করত এবং বর্ষা মৌসুমে পানি ধরে রেখে সারা বছর মাটির স্তরকে সজীব রাখত।
অধ্যাপক আইনুন নিশাতের মতো পানি বিশেষজ্ঞরা বারংবার হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে, আমরা যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করছি তা কেবল বর্তমানের চাহিদা মেটানোর একটি সাময়িক ও বিপজ্জনক পথ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কোনো পানির মজুদ রেখে যাচ্ছি না। গ্রীষ্মকালে যখন তাপমাত্রা তীব্র হয় এবং পানির ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়, তখন অনেক এলাকার নলকূপগুলো পানি তুলতে পারে না কারণ লেয়ার বা পানির স্তর পাম্পের নাগালের বাইরে চলে যায়। একে বলা হয় ‘ডেড স্টোরেজ’ বা মৃত মজুদ।
যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। মাটির নিচের শূন্যতা ভূমিকম্পের ঝুঁকিকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মাটির যে স্তরে পানি থাকে, সেখানে পানির চাপে মাটি স্থিতিশীল থাকে; পানি অপসারিত হলে সেখানে শূন্যতার সৃষ্টি হয় এবং বড় কোনো ভূকম্পনে পুরো শহর তাসের ঘরের মতো ধসে পড়তে পারে। এটি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং কঠিন ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা। যখন আমরা মাটির ৬০০ থেকে ১০০০ ফুট নিচ থেকে পানি তুলছি, তখন সেই স্তরের মাটি শুষ্ক ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। ভূতাত্ত্বিকরা মনে করেন, ঢাকার নিচের ভূতাত্ত্বিক গঠন বা ‘মধুপুর কাদা’ স্তরটি যথেষ্ট শক্ত হলেও অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে তা দীর্ঘমেয়াদে তার ভারসাম্য হারাবে।
এটি কেবল একটি পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিও বটে। কারণ একটি দেশের রাজধানী যদি পানির অভাবে অচল হয়ে পড়ে, তবে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর পড়বে।
আমাদের দেশে ওয়াসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্প নির্ভরতায় বেশি আগ্রহী। বড় বড় বাজেট, পাইপলাইন স্থাপন আর হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রজেক্টের ভিড়ে টেকসই প্রাকৃতিক সমাধানের বিষয়টি ঢাকা পড়ে যায়। মোহাম্মদ আমিনুর রসুল বাবুলের কথায় এটি স্পষ্ট যে, ২০৩০ বা ২০৫০ সালের যে রূপকল্প দেখানো হচ্ছে, তাতে মানুষের বর্ধিত চাপ ও মাটির ধারণক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত। ঢাকার জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে কেবল বাইরের নদী থেকে পানি এনে কুলাবে না।
আমাদের বৃষ্টির পানিকে আশীর্বাদ হিসেবে নিতে হবে। বছরে বাংলাদেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়, তার একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি আমরা মাটির নিচে পাঠাতে পারতাম, তবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এত দ্রুত নামত না। প্রতিটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে পানি সংগ্রহ করে তা সরাসরি ফিল্টার করে মাটির নিচের স্তরে পাঠানোর প্রযুক্তি বিশ্বের অনেক দেশেই এখন বাধ্যতামূলক। আমাদের এখানেও আইন আছে, কিন্তু তার বাস্তবায়ন নেই।
উল্টো আমরা পুকুর চুরি করছি, খাল ভরাট করে আবাসন গড়ছি। অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ঠিকই বলেছেন যে, জলাধারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং খালগুলোর দখল-দূষণই আমাদের এই পরিণতির মূল কারণ। আমাদের খালগুলো যদি সচল থাকত, তবে সেগুলো কেবল নিষ্কাশন নয়, বরং পানির স্তরের রিচার্জ পয়েন্ট হিসেবে কাজ করত।
বর্তমানের ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ সারি আর পানির জন্য হাহাকার কেবল শুরু মাত্র। গ্রীষ্মের প্রখর রোদে যখন পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাবে, তখন পরিস্থিতি দাঙ্গার রূপ নিতে পারে। গৃহস্থালির কাজ থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা—সবই আজ পানির ওপর দাঁড়িয়ে।
অথচ আমরা পানির অপচয় করছি সীমাহীন। এক লিটার বিশুদ্ধ পানি তৈরিতে যে পরিমাণ শক্তি ও অর্থ ব্যয় হয়, তার মূল্যায়ন আমাদের কাছে নেই। বিদেশে বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ ব্যবহৃত পানির পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে পূরণ করে। তারা পানির এক ফোঁটাও নষ্ট হতে দেয় না। ইসরায়েল মরুভূমির দেশ হওয়া সত্ত্বেও প্রযুক্তির কল্যাণে এবং সমুদ্রের লবণাক্ত পানি শোধনের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। তারা কৃষিকাজে শতভাগ শোধিত বর্জ্য পানি ব্যবহার করে।
আমাদের সম্পদ সীমিত হতে পারে, কিন্তু সদিচ্ছার অভাবই বড় সমস্যা। ঢাকা ওয়াসা তাদের প্রকল্প কেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে যদি দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পরিকল্পনায় নজর না দেয়, তবে আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাবে। জনবসতি ও চাহিদার চাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে কেবল গভীর নলকূপ দিয়ে পানি সরবরাহ করাটা বালিতে মুখ গুঁজে ঝড় থামানোর চেষ্টার মতো। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাটির নিচের এই পানি কোনো অন্তহীন ভাণ্ডার নয়।
এটি একটি গচ্ছিত আমানত যা আমরা আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। আজ আমরা যে বিলাসিতা করছি, তার চড়া মূল্য দিতে হবে আগামীর ঢাকাবাসীকে। পানির জন্য হাহাকার যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বা যখন মাটি দেবে গিয়ে শহরটি ধ্বংসের মুখে পড়বে, তখন কেবল আক্ষেপ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না।
শহরের কংক্রিটের জঙ্গল ভেদ করে মাটিকে শ্বাস নিতে দিতে হবে। আমাদের প্রতিটি পার্ক ও খেলার মাঠ যেন কেবল ঘাস আর মাটি দিয়ে ঢাকা থাকে, সেখানে যেন সিমেন্টের কারুকাজ না হয়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের সচেতন হতে হবে পানির ব্যবহারে। কিন্তু তার চেয়েও বড় দায়িত্ব সরকারের। নদীগুলোকে দখলমুক্ত করে সেগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। বুড়িগঙ্গার তলার কয়েক ফুট পুরু পলিথিন ও বর্জ্যের স্তর সরাতে না পারলে নদীর পানি মাটির নিচে যেতে পারবে না। একইভাবে যমুনা বা ব্রহ্মপুত্র থেকে পানি আনার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় আরও গতি আনতে হবে।
ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর পর্যায়ক্রমে উচ্চহারে কর বসাতে হবে যেন শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সময় এখনই সচেতন হওয়ার, নদীকে তার প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার এবং মাটির নিচের তৃষ্ণার্ত জঠরকে শান্ত করার। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে ধ্বংস করার যে উল্লাস আমরা দেখছি, তা মূলত এক আত্মহননের পথ। এই পথ থেকে ফিরে আসতে না পারলে এক মহাবিপদ সংকুল ভবিষ্যতের দিকে আমরা দ্রুত ধাবিত হচ্ছি, যেখানে স্বচ্ছ পানির এক ফোঁটাও হয়তো মিলবে না সোনার দামে।
বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক-সবারই সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং নীতি-নির্ধারকদের দূরদর্শী পদক্ষেপই পারে ঢাকা শহরকে এই আসন্ন মরুভবন থেকে রক্ষা করতে। নদী, মাটি আর জল-এই তিনের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে আমাদের তিলোত্তমা ঢাকা একদিন কেবল ইতিহাসের পাতায় এক পানিশূন্য জনপদ হিসেবে ঠাঁই পাবে। সেই ভয়াবহ পরিণতির দায়ভার আমাদেরই নিতে হবে যদি আমরা আজ আমাদের অভ্যাস ও পরিকল্পনা পরিবর্তন না করি।
পানির অপর নাম জীবন তখনই হবে যখন আমরা প্রকৃতির সেই অমূল্য সম্পদকে রক্ষা করতে শিখব, শোষণ করতে নয়। এই সংকটের উত্তরণ কেবল প্রকৌশলগত নয়, এটি একটি নৈতিক ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। মাটির নিচের শেষ জলবিন্দুটি ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের জেগে উঠতে হবে।